পৃথিবী বদলে দেয় যে ভ্যাকসিন

পৃথিবী বদলে দেয় যে ভ্যাকসিন
আধুনিক সময়ে টিকার জন্য সবচেয়ে বেশি হাহাকার দেখা গেছে চলতি বছর কোভিড-১৯ টিকার জন্য। শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত টিকার দেখা মিলেছে।

প্রথম দেশ হিসেবে ব্রিটেনে করোনার টিকা হিসেবে ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকার প্রয়োগ শুরু হয়েছে গত সপ্তাহে। সোমবার থেকে ব্যাপক হারে এই টিকার প্রয়োগ শুরু হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে।

মহামারীর মতো ভাইরাসে টিকার হাহাকার ও টিকা পাওয়ার জন্য মানুষের দেশ ত্যাগের চেষ্টার মতো ঘটনা শোনা গেলেও টিকা কিন্তু একদিনেই মানুষের মধ্যে এমন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

টিকার নির্ভরযোগ্যতা তৈরি হতেও লেগেছে সময়। অন্যদিকে টিকার জন্য রাতদিন অপেক্ষা প্রাত্যহিক হয়ে পড়লেও মানুষ ভুলে গেছে খোদ টিকার পথিকৃৎকেই। জেনে নেয়া যাক পৃথিবী বদলে দেয়া তিনটি টিকা ও টিকার পথিকৃৎ সম্পর্কে। সিএনট্রাভেলার, বিবিসি।

গুটিবসন্তের টিকা : বর্তমান সময়ে প্রতিষেধক হিসেবে মানুষের মধ্যে টিকার চাহিদা প্রচুর। তবে টিকার ইতিহাস শত শত বছর পুরনো। প্রাচীনকালে চীনের বৌদ্ধ মঙ্করা সাপে কাটার প্রতিষেধক হিসেবে সাপের বিষ পান করতেন। এছাড়া গরু থেকে হওয়া কাউপক্স ও তার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ গুটিবসন্ত থেকে বাঁচার জন্য তারা ভ্যারিওলেশন পদ্ধতি ব্যবহার করতেন।

১৭ শতাব্দীতে চীনে এগুলোর প্রচলন ছিল। এরই সূত্র ধরে ব্রিটিশ চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড জেনার ১৭৯৬ সালে আবিষ্কার করেন গুটিবসন্তের টিকা। কাউপক্স বা ভ্যাকসিনিয়া ভাইরাস থেকে একটি শিশু জেমস ফিপসকে সারিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি কাউপক্সের প্রতিষেধকের সঙ্গে গুটিবসন্তের সংযোগ দেখতে পান।

শেষ পর্যন্ত তার অনুমান ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা সফলতার পথ দেখে। ১৭৯৬ সালে আবিষ্কারের পর ১৭৯৮ সালে পুরোমাত্রার উন্নত টিকা আসে বাজারে। প্রথম দিকে ‘টেম্পল অব ভ্যাকসিনিয়া’ নামে নিজের বাগানে ছোট একটি কটেজ তৈরি করে সেখানে গরিব মানুষের জন্য ফ্রি টিকাদানের কাজ শুরু করেন জেনার।

ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়। টিকা প্রয়োগের ভালো ফলও পাওয়া যায়। এভাবে ১৮ ও ১৯ শতকজুড়ে ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ১৯৭৯ সালে পৃথিবী থেকে গুটিবসন্ত নির্মূল সম্ভব হয়।

কলেরা ও প্লেগের টিকা এবং বিস্মৃত পথিকৃৎ : টিকার ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া দুটি টিকা হচ্ছে কলেরা ও প্লেগের টিকা। এই দুটি টিকার সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে একজনের নাম ও ভারত, ফ্রান্স এবং রাশিয়ার ইতিহাস। এর পেছনে যে মানুষটি কাজ করেছেন টিকা তথা ভ্যাকসিনের পথিকৃৎ হিসেবে, তিনি অনেক বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে গেছেন। নাম থেকে গেছে অন্যদের। ১৮৯৪ সালের মার্চ মাসে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতার এক বস্তিতে এক বিদেশি অনেক মানুষকে কলেরা টিকা দেন। দেখতে ব্রিটিশ মনে হলেও তিনি ছিলেন রাশিয়ান ইহুদি। ওয়াল্ডিমার হাফকিন নামের এই জীববিজ্ঞানী আগের বছরও কলেরার মৌসুমে ভারতে এসেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল নিজের আবিষ্কৃত কলেরার ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা যাচাই করা।

কিন্তু মানুষের অনাস্থা ও ব্রিটিশ সরকারের বাধার মুখে অকৃতকার্য হয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। একে তো চিকিৎসক নন, তার ওপর রুশ ইহুদি হওয়ায় তাকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছিল। কিন্তু কলকাতার এক জলাশয়ে কলেরার জীবাণু শনাক্ত করার জন্য কলকাতার মেডিকেল অফিসার তাকে আমন্ত্রণ জানান। ওই সময় দশজন কলেরা আক্রান্ত হয়ে সাতজন মারা যান।

এর আগে কোনো স্বেচ্ছাসেবক না খুঁজে ১৮৯২ সালের ১৮ জুলাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাফকিন কলেরার জীবাণুর সঙ্গে নিজের আবিষ্কৃত ভ্যাকসিন নিজের শরীরেই গ্রহণ করলেন।

সে সময় সামান্য জ্বরে ভুগতে হয়েছে তাকে। কিন্তু দ্রুতই সুস্থ হয়ে ওঠেন। হাফকিন সেখানে নিজের আবিষ্কৃত কলেরা টিকা দেন ১১৬ জনকে। কিছুদিনের মধ্যেই হাফকিনের কলেরা ভ্যাকসিন নেয়ার জন্য মানুষ ভিড় বেড়ে যায়।

তিনি সারাদিন বস্তিগুলোতে অবস্থান করতেন। ভোরে মানুষ কাজে বের হওয়ার আগে তিনি টিকা দেয়া শুরু করতেন। ওই সময় মুম্বাইয়ে প্লেগের সংক্রমণ দেখা দিলে ব্রিটিশ সরকারের অনুরোধে তিনি প্লেগের প্রতিষেধক উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা শুরু করেন।

এতে সফলতা পাওয়ার পর পুরো বিশ্বে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৩০ সালের ২৬ অক্টোবর এই মহান বিজ্ঞানী সুইজারল্যান্ডে মারা যান। ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পথিকৃৎ হলেও মহান মানুষটিকে ভুলে গেছে বিশ্ব।