শীতকালে ইসলামের বসন্ত

প্রকৃতির চলমান ধারায় ও বৈচিত্র্যময় ঋতুচক্রের পালাবদলে আগত শীতমৌসুম আমাদের মাঝে অন্যরকম অনুভূতির সঞ্চার করে। পবিত্র কোরআনে শীত মৌসুম সম্পর্কে সরাসরি আলোচনা করা হয়েছে।

সূরা কুরাইশে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, (হস্তিবাহিনীর হাত থেকে আমি কুরাইশদের রক্ষা করেছি) কুরাইশদের আগ্রহের জন্য। তাদের আগ্রহ শীত ও গ্রীষ্মের প্রতি।

সুতরাং তারা যেন এই ঘরের রবের ইবাদত করে। যিনি তাদেরকে ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন এবং নিরাপদ করেছেন ভয় থেকে।

আমাদের জাতীয় কবি নজরুলের `ঝিঙেফুল` কবিতায় শীতের এই বৈচিত্র্য অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে- `ঝিঙেফুল ঝিঙেফুল/ফিরোজিয়া ফিঙেকুল, ঝিঙেফুল/পৌষের বেলা শেষ/জরিজাফরানি বেশ/মরা মাচানের দেশ/করে তোলে মশগুল, ঝিঙেফুল। ` আমাদের মতো নাতিশীতোষ্ণ দেশে এখন শীত মৌসুম চলছে।

আধ্যাত্মিক রোমাঞ্চ :

দক্ষিণ গোলার্ধে এ সময় রাত দিনের তুলনায় কিছুটা বড় হয়। কারো জন্য এতে সুবিধে হয় আর কারো অসুবিধে । কিন্তু এই সময়টা অর্থাৎ শীত মৌসুম মুমিনের জন্য আল্লহরর নৈকট্য অর্জনের এক মহাসুযোগ। এ সুযোগ আমাদের সকলেরই কাজে লাগানো উচিত ।

রসুল (স.) বলেছেন, শীত হচ্ছে মুমিনের বসন্ত, কারণ শীতের রাত দীর্ঘ তাই রাতে সে সালাত আদায় করে। পক্ষান্তরে দিন ছোট তখন সে তাতে রোজা রাখে। তিনি আরো বলেন, শীতকালে রোজা হলো সহজ গনিমত।

হযরত আলী (রা.) একদা সাহাবিদেরকে উদ্দেশ করে বললেন, আমি কি তোমাদেরকে বিনা ক্লেশে গনিমত অর্জনের পথ দেখাবো? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, অবশ্যই। তখন তিনি বললেন, শীতকালে রোজা রাখো। এর অর্থ হলো, এটি এমন একটি গনিমত যেখানে দুঃখ, কষ্ট কোন ধরনের পরিশ্রম করতে হয় না। শীতের রাতে ঘুমাতে ঘুমাতে পিঠ ব্যথা হয়ে যায়।

গোয়ালের গৃহপালিত পশুগুলোও দীর্ঘ রাত কাটাতে গিয়ে হাপিয়ে উঠে। ভোরের অনেক আগেই জেগে উঠে বনের পশু-পাখিরা। কিন্তু সম্ভবত আমরা মানুষরাই শুধু অলসতা করে বিছানায় পড়ে থাকি। যারা নিয়মিত ফজরের নামাজ পড়ে থাকেন তাদের জন্য তাহাজ্জুদের মতো একটি ফজিলতপূর্ণ সালাত আদায় করার বিরাট সুযোগ রয়েছে এই শীত মৌসুমে। আর যাদের ভোরে ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস নেই তারাও এই শীতে সু-অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। তাহাজ্জুদের নামাজের ফজিলত, মর্যাদা ও গুরুত্ব আশা করি সকলেরই জানা। আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম উপায় ও শর্ত হলো এই সালাত। রাতের শেষ অংশকে লাইলাতুল ক্বদরের সাথে তুলনা করা হয়। হাদিসে আছে, এ সময় আল্লহতাআলা (বিশেষ রহমত) প্রথম আসমানে অবতীর্ণ হয় এবং তার মুমিন বান্দাদের উদ্দেশ করে বলতে থাকেন, তোমাদের কেউ কি আছ ক্ষমাপ্রাথী আমি তাকে ক্ষমা করে দিব। কেউ কি আছ অভাবী আমি তার অভাব দূর করে দিব। কেউ কি আছ দুঃখ-দুর্দশাগ্রস্ত আমি তাকে মুক্তি দিব … এভাবে সুবহে সাদিক পর্যন্ত। মোটকথা, শেষ রাতের এবাদত আল্লাহর কাছে অতি প্রিয়। আমাদের শত-সহস্র সমস্যা জর্জরিত জাতির মঙ্গলের জন্য আল¬¬াহর কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করার এটিই উত্তম সময়।

উপরে বর্ণিত হাদিসের দ্বিতীয় অংশ নিয়ে এবার আমরা আলোচনা করি। শীত মৌসুমে দিন খুব ছোট। তাই এ সময় সাওম বা রোজা রাখা অন্যান্য সময়ের চেয়ে অনেক সহজ। সুতরাং এ সুযোগ আমরা সহজেই আদায় করতে পারি। পবিত্র রমজান মাসে যাদের রোজা কাজা হয়েছে তারা এ সুযোগে রোজাগুলো রেখে দিতে পারেন।

মানবিক দায়িত্ব:

শীতের প্রকোপে কাঁপছে বাংলাদেশ। আমাদের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর অনেকেরই নেই শীতবস্ত্র। জনসেবা করার এক মহাসুযোগ এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের সামনে। আমাদের অতিরিক্ত অথবা পুরাতন ব্যবহারযোগ্য শীতবস্ত্রগুলো গরিব ও অসহায়দের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি। তাদের বোঝা কিছুটা হালকা করতে পারি। আল্ল¬াহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি। দেশের আপামর জনতার সেবা করা আমাদের সকলের নৈতিক ও ঈমানি দায়িত্ব।

পর্যটন হোক ঈমানের ভ্রমণ :

শীত মৌসুমে আমাদের দেশে পর্যটন, ভ্রমণ একটি অনবদ্য সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। আল্লাহপাক কোরআন করিমের অসংখ্য স্থানে সৃষ্টির অস্তিত্বের রহস্য জানা ও বোঝার শিক্ষাগ্রহণের স্বার্থে ভ্রমণকে উৎসাহিত করা হয়েছে। প্রকৃতির রকমারি সাজ আমাদের এদেশকে পৃথিবীর ভূগোলে এক ঈর্ষণীয় মর্যাদা দান করেছে। শীতের পর্যটনে আমরা আনন্দাবগাহনে প্রকৃতির নানা মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখে নিজের অন্তরকে ঈমানি চেতনায় তৃপ্ত করতে পারি। আনন্দভ্রমণগুলো হতে পারে ঈমান ও বিনোদনের অপূর্ব সমন্বয়।

ওয়াজ-মাহফিল-সংস্কৃতি হোক

দাওয়াতী গাম্ভীর্যের :

শীতকালে আমাদের দেশের গ্রাম-গঞ্জ এমনকি শহরে শহরে ওয়াজ মাহফিলের ধুম পড়ে যায়। তীব্র শীতে লেপ-কম্বলের তলে মুটিয়ে যাওয়া শরীরটাকে ঈমানি জযবায় চাঙা করে তুলতে ওয়াজ-মাহফিলের ভূমিকা অনন্য। এ সময় মাহফিলের বক্তারা আবেগঘন সুরে মননশীল বাচনভঙ্গিতে বক্তৃতা দিয়ে মুসলমানদের হৃদয়কে জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হন। ওয়াজ-মাহফিলগুলোতে ইসলামি সঙ্গীতায়োজন আগেও ছিলো; তবে এখন এতে নতুনত্ব ও সৃজনশীলতার মাত্রা যোগ হয়েছে। যা ওয়াজ-মাহফিলগুলোকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে। শীতকালীন ওয়াজ-মাহফিলের এ সংস্কৃতি আমাদের শীতকালকে বিচিত্রময়তা দান করেছে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, বর্তমানে মুসলমানদের স্মরণকালের বিশ্ব ইজতেমা আমাদের দেশেই হয়ে থাকে। এ ইজতেমাতে যোগদান করতে আসেন বিশ্বের নানান দেশের মানুষ। এ বিশ্ব ইজতেমাও কিন্তু শীতকালের সময়েই হয়ে থাকে।

তবে দুঃখের সাথে সাথে বলতে হয়, আমাদের ওয়াজ মাহফিলগুলোতে আনুষ্ঠানিক লৌলিককতার চেয়ে দাওয়াতি গাম্ভীর্য দরকার বেশী।

শী ত কা লে
ই স লা মে র ব স ন্ত

মুফতি হারুন ইজহার হাফি. পেইজ থেকে!