হাজারো আলেমকে ব্যবসার পথ দেখাচ্ছে কওমি উদ্যোক্তা

দেশের নাগরিকদের বড় একটি অংশ মাদরাসার শিক্ষার্থী ও মাদরাসা থেকে পড়াশোনা সমাপ্ত করা আলেম-উলামা। তাদের বেশির ভাগের কর্মক্ষেত্র মসজিদ মাদরাসা ও ধর্মীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

তবে, আলেমদের অনেকেই এখন যুক্ত হচ্ছেন নানা পেশায়। কেউ বেছে নিচ্ছেন ব্যবসার পথ। কেউ করছেন সাংবাদিকতা। আবার কেউবা নিয়োজিত হচ্ছেন সমাজসেবায়।

আলেম হয়েও যে ব্যবসা করা যায় এই বাস্তবতাকে স্বীকার করছেন এখন অনেকেই।

বৈশ্বিক মহামারী করোনার সময় অবরু’দ্ধ হয়ে বহু মানুষ যখন কর্মসংস্থান হারাচ্ছিল, তখন আলেম-উলামাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ দেখিয়েছে ‘কওমি উদ্যোক্তা’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপ।

‘নিজের কথা কও’ এই স্লোগান নিয়ে ফেসবুক গ্রুপ কওমি উদ্যোক্তার যাত্রা শুরু হয় গত ২ জুন। এর পেছনের কারিগর কওমি মাদরাসা থেকে পড়াশোনা সমাপ্ত করা একঝাঁক তরুণ আলেম। যারা নিজেরা ব্যবসা করার পাশাপাশি হাজারো আলেম-উলামাকে ব্যবসার পথ দেখাচ্ছে।

কওমি উদ্যোক্তা গ্রুপের সদস্য সংখ্যা এখন এক লাখ ২৫ হাজারের বেশি। প্রতিদিন এ গ্রুপে লাখ টাকার বেশি বেচাকেনা হয়।

কওমি উদ্যোক্তা গ্রুপের প্রধান তরুণ আলেম ও সাংবাদিক রোকন রাইয়ান আলেম ব্যবসায়ীদের এই প্ল্যাটফর্ম তৈরি সম্পর্কে বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই চাইতাম নিজে ব্যবসা করবো।

শিক্ষাজীবনেই জেনেছিলাম আমাদের প্রিয় নবী সা. ব্যবসা করেছেন, ইমাম আবু হানিফা রহ.-সহ মুসলিম ইতিহাসের অনেক খ্যাতনামা আলেম ব্যবসা করেছেন, এমনকি নিকট অতীতের শায়খুল ইসলাম হোসাইন আহমদ মাদানি রহ. ১৮ বছর টুপি, রুমাল ও জায়নামাজ বিক্রি করেছেন।

রোকন রাইয়ান বলেন, ২০১৯ সালের শুরুতে একটি অনলাইন শপ করি এবং বেশ সাড়া পাই। তখন থেকেই ব্যবসার প্রতি আগ্রহ বাড়ে। করোনাকালের অবসরে অনেকেই আলেমদের বিকল্প পেশার কথা বলছিলেন।

সেই চিন্তা থেকেই কওমি উদ্যোক্তার জন্ম। আলহামদুলিল্লাহ! কল্পনাতীত সাড়া পাচ্ছি আমরা। প্রতিদিন এক হাজারেরও বেশি মানুষ গ্রুপে যুক্ত হচ্ছে।’

জানা গেছে, কওমি উদ্যোক্তা গ্রুপের বেশিরভাগ বিক্রেতা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। আর বেচাকেনার শীর্ষে আছে খাদ্যপণ্য। এর মধ্যে আছে মধু, ঘি, তেল, চা পাতা, হিমায়িত গোশত, আমসহ অন্যান্য মৌসুমি ফল।

এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের মসলা, আচার, সুপারি, শিমের বিচি, গামছা, লুঙ্গি, টুপি, জুতা, পাঞ্জাবি, থ্রিপিস থেকে শুরু করে নকশি কাঁথা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে কওমি উদ্যোক্তায়।

কওমি উদ্যোক্তাকে এগিয়ে নিতে রোকন রাইয়ানের সাথে কাজ করছেন আরো কয়েকজন উদ্যমী তরুণ। এদের মধ্যে রয়েছে হাফেজ মুমিনুল ইসলাম। রাজধানীর একটি মাদরাসায় শিক্ষকতার পাশাপাশি আইটি নিয়ে কাজ করছেন তিনি।

এছাড়াও মডারেটর হিসেবে গ্রুপে যুক্ত রয়েছেন আরো কয়েকজন। তাদের সবার একান্ত পরিশ্রম, সততা ও ইখলাসের উপর ভর করে এগিয়ে যাচ্ছে গ্রুপটি।

আলেমদের ব্যবসায় যুক্ত হওয়াকে ইতিবাচক দেখছেন দেশের শীর্ষ আলেমরাও। বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান ও ঐতিহাসিক শোলাকিয়ার প্রধান ইমাম আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ আলেমদের ব্যবসা করা প্রসঙ্গে বলেন, আলেমরা ব্যবসা করছেন এটা মন্দ কিছু না।

আমাদের আকাবিররাও ব্যবসা করেছেন। ইমাম আজম আবু হানিফা রহ.ও ব্যবসা করেছেন। তবে শর্ত হলো, ব্যবসা করতে গিয়ে ইলমের সাথে সংশ্লিষ্টতা পরিপূর্ণ বর্জন করা যাবে না। পড়া ও পড়ানোর সাথে সম্পর্ক রাখতে হবে। তাহলে ব্যবসায় যুক্ত হতে কোনো সমস্যা নেই।

বর্তমানে আলেমরা ব্যবসার দিকে ধাবিত হচ্ছেন, এই বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে গবেষক আলেম ও চট্টগ্রাম ওমর গণি কলেজের ইতিহাসের সাবেক অধ্যাপক ড. আ ফ ম খালিদ হুসাইন বলেন, বিষয়টিকে আমি ইতিবাচক হিসেবেই দেখতে চাই।

কারণ, নবীজি সা. ও সাহাবায়ে কেরামের জীবনের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, তারাও ব্যবসা করেছেন। হযরত আবুবকর, উমর, উসমান ও হযরত আবদুর বিন আউফ রা. অনেক বড় ব্যবসায়ী ছিলেন।

সুতরাং আলেমরা ব্যবসার দিকে ধাবিত হচ্ছেন এটি একটি ইতিবাচক দিক। এর দ্বারা আলেমরা স্বাবলম্বী হবেন, সমাজের প্রতি তাদের আর্থিক মুখাপেক্ষিতা কমবে। তারা পূর্ণ ইখলাসের সাথে দ্বীনি খেদমত করতে পারবেন।

বাংলাদেশ কওমি মাদরাসার শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার সাবেক মহাপরিচালক মাওলানা জুবায়ের আহমদ চৌধুরী বলেন, ইসলামে ব্যবসা শুধু বৈধই নয় বরং একাজে মানুষকে উৎসাহিতও করা হয়েছে।

ব্যবসার মধ্যে মধ্যে বরকত বেশি। শর্ত হলো হালাল ব্যবসা হতে হবে। আলেমরা যদি ব্যবসা করেন, তাহলে হালাল ব্যবসা বেশি হবে। সুতরাং ব্যবসা করতে কোনো সুবিধা নেই।

তিনি বলেন, আমার পরামর্শ হলো, যেসব আলেমরা মাদরাসা মসজিদে ও ওয়াজের ময়দানে কাজ করতে পারেন, তারা করবেন। আর বাকিরা নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যবসা করবেন। হাদিসে আছে, নিচের হাতের চেয়ে ওপরের হাত উত্তম।

কারো কাছে হাত পাতার চেয়ে নিচে স্বাবলম্বী হওয়া ভালো। ইসলামে কোনো ভিক্ষাবৃত্তির ধর্ম নয়। আলেমরা যে ব্যবসা করছেন এটা অবশ্যই একটি প্রশংসনীয় বিষয়।