সব মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে: মিজানুর রহমান আজহারি

ঐক্যবদ্ধ জীবন ছাড়া মানুষের কল্যাণ হতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক ইসলামিক স্কলার মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারি।

সোমবার মালয়েশিয়ার স্থানীয় সময় বিকেলে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল কুয়ালামাপুরে কায়েদ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এর উদ্যোগে আয়োজিত ইফতার মাহফিলে অংশ নিয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন।

মিজানুর রহমান আজহারি বলেন, হযরত কায়েদ সাহেব হুজুর যে ঐক্যনীতি বিশ্বাস করতেন,আজ সমাজে তার যথেষ্ট অভাব রয়েছে।

ঐক্যবদ্ধ জীবন ছাড়া মানুষের কল্যান হতে পারেনা। তাই সব মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মানুষ হিসেবে সবাইকে নিয়ে সমাজের পরিবর্তন করতে হবে।

তিনি বলেন, দেশের মানুষ ও সমাজের ভাগ্যের পরিবর্তনে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে কাজ করতে হবে। যুবকদের কর্ম সংস্থান তৈরি করতে হবে। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের মান সম্মান রক্ষায় কমিউনিটির সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একত্রে কাজ করতে হবে।

আজহারি বলেন, রমাদানের এই শেষ সময়ে আমাদেরকে ইতেকাফ করে, শেষ দশ দিনে শবে কদরকে খুঁজে নিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে ইবাদতে মশগুল থাকতে হবে।

ইফতারে উপস্থিত,দল মত ও সব পেশার মানুষদেরকে ও কায়েদ ফাউন্ডেশনকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

মালয়েশিয়া সরকারের স্বাস্থ্যবিধি এসওপি মেনে কায়েদ ফাউন্ডেশনের বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট ডক্টর ফয়জুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বাংলাদেশী স্টুডেন্ট ইউনিয়ন মালয়েশিয়ার সিনিয়র সহসভাপতি, পিএইচডি গবেষক আলমগীর চৌধুরী আকাশের পরিচালনায় শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন, মোহাম্মদ সেলিম ও ব্যাবসায়ী মাহবুব আলম শাহ,জাহাঙ্গীর হাওলাদার।

এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন ব্যাবসায়ী মোশাররফ হোসেন, ইকবাল হোসেন, রাসেল রানা, হাজী মুহাম্মদ বাদল হোসেন, মুহাম্মদ সবুজ, মুহাম্মদ বাদল সরদার,সবুজ হোসেইন, হিমেল,ডা.পারভেজ, ড. সাইফুল ইসলাম।

ইফতার মাহফিলের সার্বিক নিরাপত্তায় আসাদুজ্জামান মাসুম,নাছিম আরাফাত ও রিয়াজ মাহমুদের নেতৃত্বে একদল সেচ্ছাসেবক দায়িত্বপালন করেন।

সভাপতি ড. ফয়জুল হক তার বক্তব্যে বলেন, কায়েদ ফাউন্ডেশন যার নামে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, সেই হযরত কায়েদ সাহেব হুজুর রহ. ছিলেন আজীবন ঐক্য প্রতিষ্ঠার অগ্রনায়ক।

তিনি সমাজের সকল আস্তিকদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা, দল ও রাজনীতির ঊর্ধ্বে হানাহানী মুক্ত একটি আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে গেছেন। মানুষের কল্যান ও ইসলাম প্রতিষ্ঠায় নিজ বাড়িতে ৪২ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন।

ড. ফয়জুল হক বলেন, দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ হিসেবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পেয়েছেন স্বর্ণ পদক। ১৩ তম মৃ’ত্যুবার্ষিকীতে মহান আল্লাহর দরবারে একটাই কামনা, তিনি যেনো হযরত কায়েদ সাহেব হুজুরকে জান্নাতুল ফেরদৌস নছিব করেন।

এবং তার রেখে যাওয়া কাজগুলোকে চালিয়ে যাওয়ার তাওফিক দান করেন।

ফয়জুল হক প্রোগ্রামটি বাস্তবায়ন করতে যারা স্পন্সর করেছেন, সবাইকে তিনি ধন্যবাদ জানান। উপস্থিত সকল ইনফিউশনের শিল্পী, সাংবাদিক, সেচ্ছাসেবক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, হোটেলে ম্যানেজমেন্ট ও দায়িত্বরত সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

ঘর, বাড়ি ও আবাসস্থল মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলোর অন্যতম। মানবজীবনে শান্তি ও স্থিতির জন্য ঘরবাড়ি অপরিহার্য। পবিত্র কোরআনেও ঘরবাড়ির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের ঘরকে করেন তোমাদের জন্য আবাসস্থল এবং তিনি তোমাদের জন্য পশুর চামড়ার তাঁবুর ব্যবস্থা করেন—তোমরা তাকে সহজ মনে কর ভ্রমণকালে ও অবস্থানকালে।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৮০)

মানবিক এই প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে ছিলেন না নবী-রাসুলগণ। তাঁরাও মানবিক প্রয়োজন মেটাতে ঘরবাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। তবে তাঁদের ঘরবাড়ি ছিল প্রদর্শন ও অর্থহীন জৌলুসমুক্ত।

প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)ও নিজের জন্য আবাস তৈরি করেছিলেন; যে ঘর মানুষকে মনে করিয়ে দেয় এই জীবন চিরদিনের জন্য নয়, বরং মুমিনের জন্য পরকালীন জীবনই প্রকৃত আবাস।

মদিনায় রাসুল (সা.)-এর বাড়ি

মদিনায় হিজরত করার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে নববি নির্মাণ করেন। মসজিদের পাশেই তাঁর দুই স্ত্রীর জন্য নির্মাণ করেন দুটি কক্ষ, যার একটি সাওদা বিনতে জামআ (রা.) ব্যবহার করতেন এবং অন্যটি আয়েশা (রা.)।

নির্মাণকালে কক্ষ দুটি ছিল মসজিদের পূর্ব দিকে। তখন কিবলা ছিল বায়তুল মোকাদ্দাস। কিবলা পরিবর্তন হওয়ার পর কক্ষ দুটি পশ্চিম দিকের দেয়ালের ওপাশে এবং নামাজের স্থান থেকে বাম পাশে চলে যায়।

অন্য কক্ষগুলো পরবর্তী সময় প্রয়োজন অনুযায়ী নির্মাণ করা হয়। তবে মসজিদের দেয়াল ও ঘরগুলোর মধ্যে পাঁচ গজের মতো দূরত্ব ছিল।

মসজিদে নববির পাশের ও সংলগ্ন ভূমির মালিক ছিলেন হারিস ইবনে নোমান (রা.)। সেখানে তাঁর বাড়ি ছিল। কিন্তু তিনি তা মহানবী (সা.)-এর প্রয়োজনে ছেড়ে দেন।

তিনি উপহার হিসেবে ছেড়ে দিলেও রাসুল (সা.) তাঁকে উপযুক্ত মূল্য পরিশোধ করেন। তাঁর পুরো বাড়িই রাসুল (সা.) ও তাঁর পবিত্র স্ত্রীদের জন্য ব্যবহৃত হতো। (আল ওয়াফা বি-আহওয়ালিল মোস্তফা, পৃষ্ঠা-২৬০)

সেখানে মোট ৯টি ঘর নির্মাণ করা হয়। অবকাঠামোতে কাঁচা ইট ও খেজুরের ডাল ব্যবহার করা হয়। চারটি ঘরের সামনে পাথরের দেয়াল বা বেড়া ছিল।

অন্যগুলোর সামনে শক্ত মাটির দেয়াল ছিল, যেন কেউ সহজেই ঢুকে যেতে না পারে। প্রতিটি ঘরের ছিল দরজা ও জানালা।

হাদিসের বর্ণনা থেকে পাওয়া যায়, আয়েশা (রা.)-এর ঘরে এক পাল্লাবিশিষ্ট কাঠের দরজা ছিল এবং তার সামনে পর্দা ঝোলানো থাকত। কোনো কোনো ঘরের সামনে ছোট কক্ষও ছিল।

সে ক্ষেত্রে মূল কক্ষে লাকড়ির তৈরি দরজা থাকত এবং ছোট কক্ষের দরজায় পর্দা ঝোলানো থাকত। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘরে সাধারণ পশমের তৈরি কাপড়ের পর্দা ব্যবহৃত হতো।

স্ত্রীদের জন্য তৈরি ঘরগুলো ছিল অপ্রশস্ত। হাদিসের বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) রাতের বেলা নামাজ আদায়ের সময় আয়েশা (রা.)-এর হাতের তালু তাঁর পায়ের নিচে পড়েছিল—এ থেকেই ঘরের উচ্চতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

হাসান বসরি (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি উসমান (রা.)-এর শাসনামলে রাসুল (সা.)-এর স্ত্রীদের ঘরে প্রবেশ করেন। তিনি তাঁর হাত দিয়ে ছাদ স্পর্শ করেন।

ঘরের আসবাব

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘর সম্পর্কে জানার পর তাঁর ঘরের জিনিসপত্র সম্পর্কে জানা যেতে পারে। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিছানা ছিল চামড়ার তৈরি এবং তার ভেতরে ছিল খেজুরগাছের ছাল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪৫৬)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, তাঁর ব্যবহৃত বালিশও ছিল চামড়ার তৈরি, যার ভেতরে ছিল খেজুরগাছের ছাল। (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৪১৪৬)

ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর বর্ণনায়ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘরের আসবাবের বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘রাসুল (সা.) একটি চাটাইয়ের ওপর শুয়ে ছিলেন। চাটাইয়ের ওপর কিছুই ছিল না। তাঁর মাথার নিচে ছিল খেজুরের ছালভর্তি চামড়ার বালিশ।

আমি তাঁর শরীরে চাটাইয়ের দাগ দেখে কেঁদে ফেললাম। তিনি বলেন, কাঁদছ কেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! কায়সার ও কিসরা ভোগ-বিলাসে মত্ত অথচ আপনি আল্লাহর রাসুল! তিনি বললেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে তাদের জন্য পার্থিব জীবন ও আমাদের জন্য পরকাল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৯১৩)

এ ছাড়া মহানবী (সা.) খেজুর পাতার ছোট চাটাইয়ের ওপর নামাজ আদায় করতেন। (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৬৫৬)

এ ছাড়াও রাসুল (সা.)-এর ঘরে একটি চেয়ার, চামড়ার মশক ও লাল রঙের চামড়ার তাঁবু থাকার বর্ণনা পাওয়া যায়।

বেছে নিয়েছিলেন কৃচ্ছ্রের জীবন

রাসুলুল্লাহ (সা.) সাদাসিধে ও কৃচ্ছ্রের জীবন নিজেই বেছে নিয়েছিলেন; যেন উম্মত পার্থিব জীবনের প্রকৃত রূপ সম্পর্কে জানতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমার ও দুনিয়ার দৃষ্টান্ত একজন আরোহীর মতো—যে একটি গাছের নিচে ছায়া গ্রহণ করে, বিশ্রাম করে এবং তাকে ছেড়ে চলে যায়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৩৭৭)

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিছানা দেখে একজন আনসারি নারী তাঁর জন্য তুলার একটি বিছানা পাঠালে তিনি তা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং বলেন, ‘আমি যদি আল্লাহর কাছে প্রতিদান চাইতাম, তবে তিনি আমাকে পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ-রৌপ্য দান করতেন।’ (শুআবুল ঈমান, হাদিস : ১৩৯৫)

উল্লেখ্য, মক্কায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিজস্ব কোনো ঘর বা বাড়ি ছিল না। খাদিজা (রা.)-কে বিয়ে করার আগ পর্যন্ত দাদা ও চাচার সঙ্গে থাকতেন এবং বিয়ের পর খাদিজা (রা.)-এর বাড়িতেই থাকতেন।