৫০ বছর ধরে ছেঁড়া কোরআন জোড়া দিয়ে যাচ্ছেন সালিম আয়াসিরা

মুহাম্মদ সালিম আয়াসিরা। বয়স ৭১ বছর। ৫০ বছর ধরে একটি কাজই করে যাচ্ছেন। তা হলো, বিভিন্ন স্থান থেকে ছেঁড়া কোরআন সংগ্রহ করে সেগুলো মেরামত ও সংরক্ষণ করা।

কোথাও পবিত্র কোরআনের কোনো কপি অবহেলিত অবস্থায় আছে জানলেই নিজের জরাজীর্ণ গাড়ি নিয়ে ছোটেন সালিম আয়াসিরা। তারপর সেগুলো পরিষ্কার, সংরক্ষণ ও বিন্যস্ত করে বিভিন্ন মসজিদ, হিফজখানা ও আফ্রিকার দেশগুলোতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

৫০ বছর ধরে আয়াসিরা এই মহৎ কাজ আঞ্জাম দিচ্ছেন। ছেঁড়া কোরআনের সন্ধানে তিনি দেশের বিভিন্ন শহর-বন্দরে ঘুরে বেড়ান। কোথাও ছেঁড়া কোরআনের সন্ধান পেলে সযত্নে তা লুফে নিয়ে সংস্কার করে কোরআনের সম্মান ফিরিয়ে দেন।

জীবনের প্রান্তসীমায় উপনীত কোরআনপ্রেমী বৃদ্ধের এই মহৎ কাজে তার সন্তানদের পাশাপাশি তাদের অধীনে কর্মরত ব্যক্তিরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন।

তার এই মহৎ কাজে ব্যক্তিগত সঞ্চয় ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনুদান থেকে প্রতি মাসে ৩০০ দিনারের চেয়ে বেশি (৪২০ ডলার) ব্যয় করেন।

তার কাজ শুধু কোরআন সংগ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং তিনি বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানমূলক পুস্তকাদিও সংগ্রহ করে তার বাসভবনের ব্যক্তিগত পাঠাগারের বিশেষ তাকে সেগুলো সংরক্ষণ করেন, সেগুলো অনুসন্ধান কারীদের অপেক্ষায় দিন গুজরান করেন।

বিন্যস্তকরণ ও বিলিকরণ

আয়াসিরার ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারটিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নিয়মিত যাতায়াত করেন। সেখানে তারা মূল্যবান পুরনো বই, সাহিত্যের বই, অভিধান, আল-কোরআনের ব্যাখ্যাগ্রন্থ অনুসন্ধান করেন, ফেরার সময় তাদের পছন্দ মতো যেকোনো বই বিনামূল্যে নিয়ে যান।

আলজাজিরা ডটনেটকে আয়াসিরা জানান, বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন দাতব্য সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় ঘানা, নাইজেরিয়া, নাইজার, মালিসহ আফ্রিকার অন্যান্য দেশে পবিত্র কোরআনের ছয় হাজারের বেশি অনুলিপি পাঠিয়েছেন।

তিনি আরো জানান, আফ্রিকাতে পাঠানো কোরআন হলো, আমি যেসব কোরআন সংগ্রহ করি, সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করি, পরিষ্কার করি এবং সেগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কার করি, সেগুলোই। যদি প্রচ্ছদ ছেঁড়া থাকে, সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জাতীয় গ্রন্থাগারে প্রেরণ করি।

আয়াসিরা তার কাছে উপলভ্য কোরআনের কপিগুলো নতুন প্রতিষ্ঠিত মসজিদগুলোতে প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহ করার পাশাপাশি বিভিন্ন হিফজখানা, সরকারি ও বেসরকারি মাদরাসার গ্রন্থাগারে কোরআনের কপিগুলো সরবরাহ করেন। এছাড়াও তিনি যেকোনো শিক্ষা ও সংস্কারমূলক কাজে তার কাছে উপলভ্য কোরআনের কপিগুলো সরবরাহ করে থাকেন।

আয়াসিরার মতে, জর্ডান কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার (একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান) বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, কোরআনে কারিমের পুরাতন অনুলিপিগুলো ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা ও সংরক্ষণ করা।

বিশেষ জ্বালানি পদ্ধতি

তার গাড়িতে কয়েক ডজন ব্যাগ রয়েছে যার মধ্যে কয়েকটিতে ব্যবহারের উপযোগী কোরআন রয়েছে, এবং কয়েকটিতে রয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত ও ব্যবহার অনুপযোগী কোরআন। এসব কোরআন তিনি বিশেষ ব্যাগে সংগ্রহ করেন এবং বিশেষ জ্বালানি পদ্ধতিতে সেগুলো ধ্বংস করে দেন।

আয়াসিরা জানান, স্বেচ্ছাসেবীদের সহযোগিতায় ব্যবহার অনুপযোগী কোরআন ও ধর্মীয় বই-পুস্তকগুলো বিশেষ পদ্ধতিতে জ্বালানোর ব্যবস্থা করেন তিনি। তিনি আরো যোগ করেন, যখন ব্যবহার অনুপযোগী কপিগুলোর একটি বিশাল সংখ্যায় সংগ্রহ হয় তখন সেগুলো আমি বিশেষ পদ্ধতিতে জ্বালিয়ে দিই এবং ছাইগুলো যেখানে সেখানে ফেলে না দিয়ে পরিবেশ দূষণ রোধকল্পে, কোরআন ও কোরআনের পাতায় লিখিত সম্মানিত নামগুলোর সম্মান রক্ষায় বিশেষ স্থানে তা দাফন করি।

জীবনের প্রান্তসীমায় উপনীত এই বৃদ্ধকে তার শারীরিক দুর্বলতা, শক্তিক্ষয়, বার্ধক্য ও নেতিয়ে পড়া শরীর এই মহৎ কাজ থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তিনি অব্যাহতভাবে তার অধীনে কর্মরত স্বেচ্ছাসেবীদের সহযোগিতায় জর্ডানের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কোরআনের ছেঁড়া কপিগুলো সংগ্রহ করে যাচ্ছেন এবং সেগুলো ব্যবহার উপযোগী করে বিভিন্ন মাদরাসা, হিফজখানা ও আফ্রিকার দেশগুলোতে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।

জ্ঞানের প্রয়োজনে যে কারো জন্যই আয়াসিরার গ্রন্থাগারটি উন্মুক্ত। তিনি জানান, গত মাসে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক সঙ্গে কিছু বিদেশী শিক্ষার্থী নিয়ে তার গ্রন্থাগারে এসেছিলেন। তারা সেখানে প্রয়োজনীয় পাঠ্যপুস্তক অনুসন্ধান করে নিখরচায় সেগুলো নিয়েছিলেন।

তার কাজ সম্পর্কে বিস্তর কথোপকথনের ফাঁকে একটি সুন্দর ঘটনা স্মরণ করেছিলেন, একসময় তিনি কোরআন ও ধর্মীয় বই পুস্তক সংগ্রহ করার জন্য একটি বিশাল আকার বর্জ্যপাত্রে প্রবেশ করেন, অসতর্কতাবশত পাত্রটি তার উপর পড়ে যায়। তৎক্ষণাৎ তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যেতে অ্যাম্বুলেন্স চলে আসে, তবে তিনি কোরআনের কপিগুলো ছাড়া অ্যাম্বুলেন্সে উঠছে অস্বীকৃতি জানান এবং তিনি কিছুক্ষণ চিৎকার করেছিলেন কোরআনের কপিগুলোসহ তাকে উদ্ধার করতে।

আয়াসিরা জর্ডানের লোকদেরকে কোরআনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং কোরআনের ছেঁড়া কপিগুলো ডাস্টবিনে ফেলে না দিয়ে সেগুলো সংরক্ষণ করে অপরকে উপকৃত করার আহবান জানিয়ে তার বক্তব্য শেষ করেন।

আয়াসিরার এই মহৎ উদ্যোগকে জর্দানের বাদশাহ দ্বিতীয় আব্দুল্লাহ বিন হুসাইনের মনোযোগ আকর্ষণ করে এবং কিছু দিন আগে রাজদরবারে আয়াসিরার জন্য একটি সম্মানসূচক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় এবং তার এই মহৎ কাজের প্রশংসা করা হয়।