আরব মুসলিমদের কোরিয়ান সংস্কৃতির পরিচয় দিতে গিয়ে কিশোরীর ইসলাম গ্রহণ

জান্নাত কোরিয়া। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পরিবারের এক কোরিয়ান কিশোরী। মাতৃভূমির প্রতি আরব পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে ইউটিউবে কোরিয়ান সভ্যতা-সংস্কৃতি তুলে ধরে আরবি ভাষায় নানা ভিডিও তৈরি করা তার কাজ।

কাজের সুবিধার জন্য আরব মুসলিমদের সম্পর্কে তার বেশ জানাশোনা হয়ে যায় এবং ২০২০ সালের মাঝামাঝিতে ইসলাম গ্রহণের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন।

ইসলাম গ্রহণের পরে আলজাজিরায় প্রকাশিত জান্নাত কোরিয়ার সাক্ষাতকারটি ভাষান্তর করেছেন বেলায়েত হুসাইন।

জান্নাত কোরিয়া নামের মেয়েটি বলেন, সত্যিকার অর্থে বৌদ্ধ পরিবারে জন্ম হলেও আমি কোনো ধর্ম ও স্রষ্টায় বিশ্বাস করতাম না। ইউটিউবে আমার অনেক ফলোয়ার ছিল।

কোরিয়ান সংস্কৃতি ও এখানে মুসলিম পর্যটকদের উপযোগী হালাল পরিষেবা প্রচারে আমি আরবি ভাষা ব্যবহার করতাম। এজন্য আমার অনেক পরিচিত আমার ধর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করত।

আমি তা এড়িয়ে যেতাম। ২০১৮ সাল আমার জন্য বেদনাদায়ক বছর। এসময় আমি খুব কঠিন জীবন অতিবাহিত করি এবং ধর্মানুরাগী জীবনের প্রয়োজন অনুভব করি।

এরপর বিভিন্ন ধর্ম বিষয়ে পড়াশোনা করি। তবে ইসলাম ধর্মটা আমার কাছে ব্যতিক্রমী ও গোছালো মনে হয়। আমি বুঝতে পারি, এটা আমার খুব নিকটবর্তী এবং ইসলামই সত্য ধর্ম।

তবে ইসলাম গ্রহণে ভয় পাচ্ছিলাম। কারণ, একজন মুসলিম নারীর অনেক দায়-দায়িত্ব; পর্দাপালন, দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ও রোজা ইত্যাদি করতে হয়।

কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে আমি প্রাথমিক ধারণা পাই এরও আগে, ২০১৩ সালে। আমার পরিচিত এক মুসলিম যুবক আমাকে ইসলাম বোঝায়। সেই থেকেই ইসলামের প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তন হয়, আমি এটিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করি।

এরই প্রেক্ষাপটে ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো আমি দক্ষিণ কোরিয়ার একটি মসজিদে যাই। পরে আরেকটি মসজিদে যাই মুসলিমদের ইবাদতের ভিডিও তৈরির কাজে।

কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে হঠাৎ মসজিদের ইমাম এসে আমাকে বলেন, ‘আল্লাহ তোমাকে অনেক ভালোবাসেন’। এ কথা আমার হৃদয় স্পর্শ করে। আমি অজান্তেই কেঁদে ফেলি।

এর কিছু দিন পর আমি লেবানন সফর করি। সেখানে গিয়েও হিজাব পরে বিভিন্ন মসজিদে যাওয়া অব্যাহত রাখি। এ সময়ে দেখি আমার চোখে পানি গড়িয়ে পড়ছে। এরইমধ্যে লেবাননে আমার বেশ কয়েকজন মুসলিম বান্ধবী গড়ে ওঠে।

আমি ইসলামের যেসব বিষয়ে আতঙ্কগ্রস্ত ছিলাম- পর্দাপালন, সালাত, রোজা ইত্যাদি- এগুলোর ব্যাপারে তারা আমাকে অভয় দিয়ে বলে, প্রথম দিন থেকেই এসব একসঙ্গে পরিপালন তোমার জন্য আবশ্যক নয়; তুমি একেকটা শেখো এবং ধীরেধীরে অভ্যস্ত হলেও সমস্যা নেই।

বান্ধবীরা আমাকে সুন্দর সুন্দর উপঢৌকন দেয়, পবিত্র কোরআন মুখস্থ করতে এবং অর্থ বুঝতে নানারকম সাহায্য করে। একপর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিই- বাকি জীবন তাদের সাথেই কাটাব।

পরে ২০২০ সালের রমজানে করোনাকালীন সময়ে ভিডিওর মাধ্যমে জানাই ‘আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি’। কারণ, আমার রবকে ছাড়া জীবন-যাপন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল।

ইসলাম গ্রহণের পর এখনো আমি ভিডিও তৈরি করি, তবে তাতে ইসলামের পরিচিতি থাকে, মুসলিমদের সম্পর্কে বিশ্বকে সত্যকথা জানাতে চেষ্টা করছি।

কোরিয়ার একাধিক সেলিব্রিটিও নিয়মিত আমার ভিডিও দেখেন এবং তারা এর দ্বারা অনুপ্রাণিত হচ্ছেন বলেও জানিয়েছেন।

আমার প্রতিটি ভিডিও লক্ষ লক্ষ মানুষ দেখছে। আমি আশা করি- এটি অব্যাহত রাখতে পারব।

ঘর, বাড়ি ও আবাসস্থল মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলোর অন্যতম। মানবজীবনে শান্তি ও স্থিতির জন্য ঘরবাড়ি অপরিহার্য। পবিত্র কোরআনেও ঘরবাড়ির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের ঘরকে করেন তোমাদের জন্য আবাসস্থল এবং তিনি তোমাদের জন্য পশুর চামড়ার তাঁবুর ব্যবস্থা করেন—তোমরা তাকে সহজ মনে কর ভ্রমণকালে ও অবস্থানকালে।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৮০)

মানবিক এই প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে ছিলেন না নবী-রাসুলগণ। তাঁরাও মানবিক প্রয়োজন মেটাতে ঘরবাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। তবে তাঁদের ঘরবাড়ি ছিল প্রদর্শন ও অর্থহীন জৌলুসমুক্ত।

প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)ও নিজের জন্য আবাস তৈরি করেছিলেন; যে ঘর মানুষকে মনে করিয়ে দেয় এই জীবন চিরদিনের জন্য নয়, বরং মুমিনের জন্য পরকালীন জীবনই প্রকৃত আবাস।

মদিনায় রাসুল (সা.)-এর বাড়ি

মদিনায় হিজরত করার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে নববি নির্মাণ করেন। মসজিদের পাশেই তাঁর দুই স্ত্রীর জন্য নির্মাণ করেন দুটি কক্ষ, যার একটি সাওদা বিনতে জামআ (রা.) ব্যবহার করতেন এবং অন্যটি আয়েশা (রা.)।

নির্মাণকালে কক্ষ দুটি ছিল মসজিদের পূর্ব দিকে। তখন কিবলা ছিল বায়তুল মোকাদ্দাস। কিবলা পরিবর্তন হওয়ার পর কক্ষ দুটি পশ্চিম দিকের দেয়ালের ওপাশে এবং নামাজের স্থান থেকে বাম পাশে চলে যায়। অন্য কক্ষগুলো পরবর্তী সময় প্রয়োজন অনুযায়ী নির্মাণ করা হয়। তবে মসজিদের দেয়াল ও ঘরগুলোর মধ্যে পাঁচ গজের মতো দূরত্ব ছিল।

মসজিদে নববির পাশের ও সংলগ্ন ভূমির মালিক ছিলেন হারিস ইবনে নোমান (রা.)। সেখানে তাঁর বাড়ি ছিল। কিন্তু তিনি তা মহানবী (সা.)-এর প্রয়োজনে ছেড়ে দেন।

তিনি উপহার হিসেবে ছেড়ে দিলেও রাসুল (সা.) তাঁকে উপযুক্ত মূল্য পরিশোধ করেন। তাঁর পুরো বাড়িই রাসুল (সা.) ও তাঁর পবিত্র স্ত্রীদের জন্য ব্যবহৃত হতো। (আল ওয়াফা বি-আহওয়ালিল মোস্তফা, পৃষ্ঠা-২৬০)

সেখানে মোট ৯টি ঘর নির্মাণ করা হয়। অবকাঠামোতে কাঁচা ইট ও খেজুরের ডাল ব্যবহার করা হয়। চারটি ঘরের সামনে পাথরের দেয়াল বা বেড়া ছিল।

অন্যগুলোর সামনে শক্ত মাটির দেয়াল ছিল, যেন কেউ সহজেই ঢুকে যেতে না পারে। প্রতিটি ঘরের ছিল দরজা ও জানালা।

হাদিসের বর্ণনা থেকে পাওয়া যায়, আয়েশা (রা.)-এর ঘরে এক পাল্লাবিশিষ্ট কাঠের দরজা ছিল এবং তার সামনে পর্দা ঝোলানো থাকত। কোনো কোনো ঘরের সামনে ছোট কক্ষও ছিল।

সে ক্ষেত্রে মূল কক্ষে লাকড়ির তৈরি দরজা থাকত এবং ছোট কক্ষের দরজায় পর্দা ঝোলানো থাকত। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘরে সাধারণ পশমের তৈরি কাপড়ের পর্দা ব্যবহৃত হতো।

স্ত্রীদের জন্য তৈরি ঘরগুলো ছিল অপ্রশস্ত। হাদিসের বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) রাতের বেলা নামাজ আদায়ের সময় আয়েশা (রা.)-এর হাতের তালু তাঁর পায়ের নিচে পড়েছিল—এ থেকেই ঘরের উচ্চতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

হাসান বসরি (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি উসমান (রা.)-এর শাসনামলে রাসুল (সা.)-এর স্ত্রীদের ঘরে প্রবেশ করেন। তিনি তাঁর হাত দিয়ে ছাদ স্পর্শ করেন।

ঘরের আসবাব

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘর সম্পর্কে জানার পর তাঁর ঘরের জিনিসপত্র সম্পর্কে জানা যেতে পারে। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিছানা ছিল চামড়ার তৈরি এবং তার ভেতরে ছিল খেজুরগাছের ছাল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪৫৬)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, তাঁর ব্যবহৃত বালিশও ছিল চামড়ার তৈরি, যার ভেতরে ছিল খেজুরগাছের ছাল। (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৪১৪৬)

ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর বর্ণনায়ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘরের আসবাবের বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘রাসুল (সা.) একটি চাটাইয়ের ওপর শুয়ে ছিলেন। চাটাইয়ের ওপর কিছুই ছিল না। তাঁর মাথার নিচে ছিল খেজুরের ছালভর্তি চামড়ার বালিশ।

আমি তাঁর শরীরে চাটাইয়ের দাগ দেখে কেঁদে ফেললাম। তিনি বলেন, কাঁদছ কেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! কায়সার ও কিসরা ভোগ-বিলাসে মত্ত অথচ আপনি আল্লাহর রাসুল! তিনি বললেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে তাদের জন্য পার্থিব জীবন ও আমাদের জন্য পরকাল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৯১৩)

এ ছাড়া মহানবী (সা.) খেজুর পাতার ছোট চাটাইয়ের ওপর নামাজ আদায় করতেন। (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৬৫৬)

এ ছাড়াও রাসুল (সা.)-এর ঘরে একটি চেয়ার, চামড়ার মশক ও লাল রঙের চামড়ার তাঁবু থাকার বর্ণনা পাওয়া যায়।

বেছে নিয়েছিলেন কৃচ্ছ্রের জীবন

রাসুলুল্লাহ (সা.) সাদাসিধে ও কৃচ্ছ্রের জীবন নিজেই বেছে নিয়েছিলেন; যেন উম্মত পার্থিব জীবনের প্রকৃত রূপ সম্পর্কে জানতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমার ও দুনিয়ার দৃষ্টান্ত একজন আরোহীর মতো—যে একটি গাছের নিচে ছায়া গ্রহণ করে, বিশ্রাম করে এবং তাকে ছেড়ে চলে যায়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৩৭৭)

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিছানা দেখে একজন আনসারি নারী তাঁর জন্য তুলার একটি বিছানা পাঠালে তিনি তা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং বলেন, ‘আমি যদি আল্লাহর কাছে প্রতিদান চাইতাম, তবে তিনি আমাকে পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ-রৌপ্য দান করতেন।’ (শুআবুল ঈমান, হাদিস : ১৩৯৫)

উল্লেখ্য, মক্কায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিজস্ব কোনো ঘর বা বাড়ি ছিল না। খাদিজা (রা.)-কে বিয়ে করার আগ পর্যন্ত দাদা ও চাচার সঙ্গে থাকতেন এবং বিয়ের পর খাদিজা (রা.)-এর বাড়িতেই থাকতেন।