হিন্দু গ্রামের প্রধান হলেন হাফেজ আজিম উদ্দিন

উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন স্থানীয় হিন্দুরা। সেখানে পঞ্চায়েত নির্বাচনে অযোধ্যার রাজনপুর গ্রাম থেকে জয়ী হয়েছেন একজন মুসলিম প্রার্থী।

হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রামটির বাসিন্দারা হাফেজ আজিম উদ্দিনকে তাদের গ্রাম প্রধান হিসেবে নির্বাচিত করেছেন।খবর-নিউজ এট্ট্রিন।

এর আগে উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যাতে বাবরি মসজিদ নিয়ে কম জল ঘোলা হয়নি। শেষ পর্যন্ত হিন্দুত্ববাদীদের জয় হয়েছে।

বাবরি মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির গড়ার অনুমতি পেয়েছে উত্তরপ্রদেশ সরকার। সেই অযো’দ্ধাতেই জয়ী হলেন মুসলিম প্রার্থী।

রাজনপুর গ্রামে হাফেজ আজিম উদ্দিনের পরিবারই একমাত্র মুসলিম পরিবার। এরপরই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই নির্বাচনে বেশ কয়েকজন প্রার্থীকে পরাজিত করেছেন হাফেজ আজিম উদ্দিন।

তিনি অযোধ্যার রুদাউলি সংসদীয় আসনের রাজনপুর গ্রামের মাবাই ব্লকের বাসিন্দা।

এই নির্বাচনের ফলই বলে দেয় যে, মানুষজন এখনও ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠেই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে। এই গ্রাম এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আর ভ্রাতৃত্ববোধের পারফেক্ট উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে।

আজিম উদ্দিন বলেন, গ্রামবাসীর ভালোবাসা এবং সমর্থন আমাকে মনোনয়ন নেওয়ার শক্তি দিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত আমি জয়ী হয়েছি।

এই গ্রামে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রয়েছে। আমরা একটা বড় পরিবারের মতো।

তিনি বলেন, এই গ্রামে তিনটি মন্দির আছে। আমি জানি গ্রামের মানুষজন আমার জয়ের জন্য তাদের দেবতার কাছে প্রার্থনা করেছে।

এমনকি তারা রোজাও রেখেছে। আমি জয়ের পরই তারা রোজা ভাঙে। আমার প্রতি তাদের এতটাই ভালোবাসা রয়েছে।

আজিম উদ্দিনের বাবাও এই গ্রামের প্রধান ছিলেন।তিনি বলেন, আমার দুই ভাই বিদেশে এবং এক ভাই শিক্ষক। পুরো গ্রাম একটা বড় পরিবার।

এখানে সবাই সবাইকে সাহায্য করতে মুখিয়ে থাকে। এখানে সব ধর্মীয় উৎসব যথাযথ মর্যাদায় পালন করা হয়।

ঘর, বাড়ি ও আবাসস্থল মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলোর অন্যতম। মানবজীবনে শান্তি ও স্থিতির জন্য ঘরবাড়ি অপরিহার্য। পবিত্র কোরআনেও ঘরবাড়ির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের ঘরকে করেন তোমাদের জন্য আবাসস্থল এবং তিনি তোমাদের জন্য পশুর চামড়ার তাঁবুর ব্যবস্থা করেন—তোমরা তাকে সহজ মনে কর ভ্রমণকালে ও অবস্থানকালে।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৮০)

মানবিক এই প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে ছিলেন না নবী-রাসুলগণ। তাঁরাও মানবিক প্রয়োজন মেটাতে ঘরবাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। তবে তাঁদের ঘরবাড়ি ছিল প্রদর্শন ও অর্থহীন জৌলুসমুক্ত।

প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)ও নিজের জন্য আবাস তৈরি করেছিলেন; যে ঘর মানুষকে মনে করিয়ে দেয় এই জীবন চিরদিনের জন্য নয়, বরং মুমিনের জন্য পরকালীন জীবনই প্রকৃত আবাস।

মদিনায় রাসুল (সা.)-এর বাড়ি

মদিনায় হিজরত করার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে নববি নির্মাণ করেন। মসজিদের পাশেই তাঁর দুই স্ত্রীর জন্য নির্মাণ করেন দুটি কক্ষ, যার একটি সাওদা বিনতে জামআ (রা.) ব্যবহার করতেন এবং অন্যটি আয়েশা (রা.)।

নির্মাণকালে কক্ষ দুটি ছিল মসজিদের পূর্ব দিকে। তখন কিবলা ছিল বায়তুল মোকাদ্দাস। কিবলা পরিবর্তন হওয়ার পর কক্ষ দুটি পশ্চিম দিকের দেয়ালের ওপাশে এবং নামাজের স্থান থেকে বাম পাশে চলে যায়। অন্য কক্ষগুলো পরবর্তী সময় প্রয়োজন অনুযায়ী নির্মাণ করা হয়। তবে মসজিদের দেয়াল ও ঘরগুলোর মধ্যে পাঁচ গজের মতো দূরত্ব ছিল।

মসজিদে নববির পাশের ও সংলগ্ন ভূমির মালিক ছিলেন হারিস ইবনে নোমান (রা.)। সেখানে তাঁর বাড়ি ছিল। কিন্তু তিনি তা মহানবী (সা.)-এর প্রয়োজনে ছেড়ে দেন। তিনি উপহার হিসেবে ছেড়ে দিলেও রাসুল (সা.) তাঁকে উপযুক্ত মূল্য পরিশোধ করেন। তাঁর পুরো বাড়িই রাসুল (সা.) ও তাঁর পবিত্র স্ত্রীদের জন্য ব্যবহৃত হতো। (আল ওয়াফা বি-আহওয়ালিল মোস্তফা, পৃষ্ঠা-২৬০)

সেখানে মোট ৯টি ঘর নির্মাণ করা হয়। অবকাঠামোতে কাঁচা ইট ও খেজুরের ডাল ব্যবহার করা হয়। চারটি ঘরের সামনে পাথরের দেয়াল বা বেড়া ছিল। অন্যগুলোর সামনে শক্ত মাটির দেয়াল ছিল, যেন কেউ সহজেই ঢুকে যেতে না পারে। প্রতিটি ঘরের ছিল দরজা ও জানালা।

হাদিসের বর্ণনা থেকে পাওয়া যায়, আয়েশা (রা.)-এর ঘরে এক পাল্লাবিশিষ্ট কাঠের দরজা ছিল এবং তার সামনে পর্দা ঝোলানো থাকত। কোনো কোনো ঘরের সামনে ছোট কক্ষও ছিল। সে ক্ষেত্রে মূল কক্ষে লাকড়ির তৈরি দরজা থাকত এবং ছোট কক্ষের দরজায় পর্দা ঝোলানো থাকত। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘরে সাধারণ পশমের তৈরি কাপড়ের পর্দা ব্যবহৃত হতো।

স্ত্রীদের জন্য তৈরি ঘরগুলো ছিল অপ্রশস্ত। হাদিসের বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) রাতের বেলা নামাজ আদায়ের সময় আয়েশা (রা.)-এর হাতের তালু তাঁর পায়ের নিচে পড়েছিল—এ থেকেই ঘরের উচ্চতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। হাসান বসরি (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি উসমান (রা.)-এর শাসনামলে রাসুল (সা.)-এর স্ত্রীদের ঘরে প্রবেশ করেন। তিনি তাঁর হাত দিয়ে ছাদ স্পর্শ করেন।

ঘরের আসবাব

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘর সম্পর্কে জানার পর তাঁর ঘরের জিনিসপত্র সম্পর্কে জানা যেতে পারে। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিছানা ছিল চামড়ার তৈরি এবং তার ভেতরে ছিল খেজুরগাছের ছাল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪৫৬)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, তাঁর ব্যবহৃত বালিশও ছিল চামড়ার তৈরি, যার ভেতরে ছিল খেজুরগাছের ছাল। (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৪১৪৬)

ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর বর্ণনায়ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘরের আসবাবের বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘রাসুল (সা.) একটি চাটাইয়ের ওপর শুয়ে ছিলেন। চাটাইয়ের ওপর কিছুই ছিল না। তাঁর মাথার নিচে ছিল খেজুরের ছালভর্তি চামড়ার বালিশ।

আমি তাঁর শরীরে চাটাইয়ের দাগ দেখে কেঁদে ফেললাম। তিনি বলেন, কাঁদছ কেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! কায়সার ও কিসরা ভোগ-বিলাসে মত্ত অথচ আপনি আল্লাহর রাসুল! তিনি বললেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে তাদের জন্য পার্থিব জীবন ও আমাদের জন্য পরকাল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৯১৩)

এ ছাড়া মহানবী (সা.) খেজুর পাতার ছোট চাটাইয়ের ওপর নামাজ আদায় করতেন। (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৬৫৬)

এ ছাড়াও রাসুল (সা.)-এর ঘরে একটি চেয়ার, চামড়ার মশক ও লাল রঙের চামড়ার তাঁবু থাকার বর্ণনা পাওয়া যায়।

বেছে নিয়েছিলেন কৃচ্ছ্রের জীবন

রাসুলুল্লাহ (সা.) সাদাসিধে ও কৃচ্ছ্রের জীবন নিজেই বেছে নিয়েছিলেন; যেন উম্মত পার্থিব জীবনের প্রকৃত রূপ সম্পর্কে জানতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমার ও দুনিয়ার দৃষ্টান্ত একজন আরোহীর মতো—যে একটি গাছের নিচে ছায়া গ্রহণ করে, বিশ্রাম করে এবং তাকে ছেড়ে চলে যায়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৩৭৭)

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিছানা দেখে একজন আনসারি নারী তাঁর জন্য তুলার একটি বিছানা পাঠালে তিনি তা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং বলেন, ‘আমি যদি আল্লাহর কাছে প্রতিদান চাইতাম, তবে তিনি আমাকে পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ-রৌপ্য দান করতেন।’ (শুআবুল ঈমান, হাদিস : ১৩৯৫)

উল্লেখ্য, মক্কায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিজস্ব কোনো ঘর বা বাড়ি ছিল না। খাদিজা (রা.)-কে বিয়ে করার আগ পর্যন্ত দাদা ও চাচার সঙ্গে থাকতেন এবং বিয়ের পর খাদিজা (রা.)-এর বাড়িতেই থাকতেন।