ইসলাম শুধুমাত্র সপ্তম শতাব্দীর ধর্ম নয়, ইসলাম অবশ্যই সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ধর্ম: মাহাথির মোহাম্মদ

মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি ডা. মাহাথির বিন মোহাম্মদ। ১৯৮১ সালে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। তার নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন দল পর পর পাঁচবার সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। তিনি এশিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

২০০৩ সালের ৩০শে অক্টোবর তিনি স্বেচ্ছায় প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেন। অবসর গ্রহণের দীর্ঘ ১৫ বছর পর ৯২ বছর বয়সে প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের ব্যাপক দুর্নীতি সংশ্লিষ্টতার কারণে মাহাথির মোহাম্মদ আবারও আসেন রাজনীতিতে। ২০১৮ সালের ৯ মে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে জয়ের পরদিন ১০ মে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি।

মাহাথিরের বয়স যখন কুড়ি বছরের একটু বেশি তখন তিনি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। সহপাঠীদের একত্র করে তিনি গোপনে ‘মালয়ান ইউনিয়ন’ প্রস্তাবের বিরুদ্ধচারণ শুরু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জাপানিরা চলে যাবার পূর্বে তৎকালীন মালয়েশিয়াকে তারা থাই সরকারের শাসনাধীনে হস্তান্তর করে। পরবর্তীতে ব্রিটিশরা আবার ফিরে আসে এবং ‘মালয়ান ইউনিয়ন’ প্রতিষ্ঠা করে।

মালয়ান ইউনিয়ন সত্যিকার অর্থে সম্পূর্ণ উপনিবেশ ছিল। মাহাথির ও তার বন্ধুরা তখন রাতের অন্ধকারে সারা শহরে রাজনৈতিক বাণী সম্বলিত পোস্টার লাগাতেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সীমিত, ‘মালয়ান ইউনিয়ন’ প্রস্তাবের সমাপ্তি এবং প্রজাতন্ত্রের মর্যাদা ফিরে পাওয়া। সাইকেল চালিয়ে তারা সমগ্র প্রদেশ ঘুরে ঘুরে জনগণকে ব্রিটিশ বিরোধী হিসেবে সংঘটিত ও সক্রিয় করার কাজে ব্যস্ত থাকতেন।

সংগঠনে মাহাথির সাধারণত সম্পাদক বা দ্বিতীয় অবস্থানটা বেছে নিতেন, কারণ দ্বিতীয় ব্যক্তিকেই বেশি সাংগঠনিক কাজ করতে হয় ও অন্য দলগুলোর সাথে যোগাযোগ রাখতে হয়। মাহাথির প্রথম কেদাহ মালয় যুব ইউনিয়ন এবং পরে কেদাহ মালয় ইউনিয়ন নামে রাজনৈতিক দল সংগঠিত করেন যা পরবর্তীতে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ইউনাইটেড মালয় ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন বা ইউএমএনও হিসেবে পরিচিত হয়।

ইসলাম ধর্মের প্রতি বিশ্বাস মাহাথিরের ভেতর আসে তার পরিবার থেকে। তার পরিবার তাকে ইসলামের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে শিক্ষা দেয়, কিন্তু তাদের কোন রূপ গোঁড়ামি ছিল না। ইসলাম সম্পর্কে এ নিউ ডিল ফর এশিয়া গ্রন্থে মাহাথির বলেন, “ইসলাম ধর্ম আমাদের জীবনের অংশ। একে পরিত্যাগ করার কোন কারণ নেই। সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা হলে ইসলাম ধর্ম কখনই অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য বাধা হতে পারে না।

ইসলামের শিক্ষা সমসাময়িক সময়ের দৃষ্টিভঙ্গিতে নিতে হবে। ইসলাম শুধুমাত্র সপ্তম শতাব্দীর ধর্ম নয়। ইসলাম অবশ্যই সর্বকালের ধর্ম।”

কুরআন ছুঁয়ে শপথ নিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম পুলিশ প্রধান

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সি অঙ্গরাজ্যের পেটারসন শহরের পুলিশ প্রধান হয়ে কোরআন শরীফ ছুঁয়ে শপথ নিয়েছেন। ইব্রাহিম বেকুরা নামের মুসলমান তুর্কি বংশোদ্ভূত কুরআন ছুঁয়ে শপথ নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন।

তিনি বাইবেলের পরিবর্তে পবিত্র কুরআন ছুঁয়ে শপথ নেন। শহরের মেয়র জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই প্রথম তুর্কি বংশোদ্ভূত কোনও ব্যক্তি এই পদে আসীন হলেন।

৬০ বছর বয়সী এই পুলিশ কর্মকর্তা প্রায় ৩০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ বিভাগে চাকরি করছেন। পেটারসন শহরের মসজিদের একজন ইমামও নতুন পুলিশ প্রধানের কুরআন ছুঁয়ে শপথের পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন। শিশুকালে পরিবারের সঙ্গে পেটারসন শহরে বসবাস শুরু করেন ইব্রাহিম বেকুরা।

এর আগেও বিভিন্ন পদে আসীন হওয়ার সময় অনেক মুসলমান কুরআন ছুঁয়ে শপথ নিয়েছেন। গত বছর পবিত্র কুরআনে হাত রেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১১৬তম কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন রাশিদা তালিব ও ইলহান ওমর। তারা হচ্ছেন মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের প্রথম মুসলিম নারী সদস্য।

আরবের তরুনদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা এরদোগান!

আরব যুবকদের কাছে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা হয়ে উঠেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান। বিবিসি আরবি বিভাগ পরিচালিত একটি জরিপে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। মঙ্গলবার প্রকাশিত ওই জরিপে আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ২৫ হাজার যুবকের মতামত নেয়া হয়, যাদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল।

প্রাপ্ত ফল অনুসারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবস্থান সবার নিচে এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট লাদিমির পুতিন দ্বিতীয় অবস্থানে। কিন্তু তাদের দুজনের সম্মিলিত গ্রহণযোগ্যতা তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের ধারেকাছেও নেই। প্রেসিডেন্ট এরদোগান র‌্যাংকিংয়ে প্রথম স্থানে রয়েছেন।

আরব যুবকদের ৫০ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা তার পক্ষে ইতিবাচক মন্তব্য করেন। ইস্তাম্বুলের মেয়র নির্বাচনে পরাজয় দীর্ঘ শাসনামলে এরদোগানের জন্য একটি ধাক্কা হলেও বিবিসির এ জরিপটি এরদোগানের সমর্থকদের জন্য কিছুটা হলেও সান্ত¡না বয়ে আনবে।

বিবিসির এ জরিপটিকে সাম্প্রতিক সময়ে পরিচালিত জরিপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় জরিপ হিসেবে বলা হচ্ছে। যদিও এই জরিপে সব আরব দেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং ফিলিস্তিনসহ ১০ দেশে ২৫ হাজারের বেশি মানুষের মধ্যে এ জরিপ চালানো হয়েছে।

২০১৮ সালের শেষ দিকে থেকে শুরু করে ২০১৯ সালের মধ্য সময় পর্যন্ত চালানো এ জরিপে আরব যুবকদের কাছে নানা বিষয়ে তাদের মত জানতে চাওয়া হয়েছিল। আরব দেশগুলোর জনগণ যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও তুরস্কের নেতাদের কতটা ইতিবাচকভাবে দেখে সে বিষয়ে মতামত জানতে চাওয়া হয়েছিল জরিপে।

১১ দেশের মধ্যে সাত দেশে ৫০ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা এরদোগানের পক্ষে মতামত দিয়েছেন। শুধু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণেই যে আরব যুবকরা এরদোগানের পক্ষে মত দিয়েছেন বিষয়টি এমন নয়। কারণ ইতিহাস বলে, তুর্কি জাতির সঙ্গে আরবদের কখনই তেমন সখ্য ছিল না। জাতি হিসেবেও তুর্কি ও আরব দুটি ভিন্ন জাতি।

তুরস্কের উসমানী সাম্রাজ্য যে কয়েকশ’ বছর মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার একটি বড় অংশ শাসন করেছে, সে সময় তারা আরব দেশের জনগণকে অধিকার বঞ্চিত করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। উসমানী খিলাফত পতনের পরও আরবদের সঙ্গে তুর্কিদের সম্পর্কের তেমন কোনো উন্নতি হয়নি।

উসমানী খিলাফত বিলুপ্ত করে কামাল আতাতুর্কের হাত ধরে পথচলা শুরু হয় আধুনিক তুরস্কের। ইস্তাম্বুলে খিলাফত বিলুপ্ত করে ধর্মনিরপেক্ষতার পথ বেছে নেয় তুরস্ক প্রজাতন্ত্র। তুরস্কের এমন পরিবর্তন মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামপন্থীদের জন্য বড় ধাক্কা ছিল।

নতুন তুরস্কের গোড়াপত্তনের পর আরবি বর্ণমালা উঠিয়ে দিয়ে চালু করা হয় ল্যাটিন বর্ণমালা। এর মাধ্যমে তুরস্কের ইসলামী আবরণ ছাড়িয়ে পাশ্চাত্যমুখী একটি সমাজব্যবস্থা গড়তে চেয়েছিলেন কামাল আতাতুর্ক। দেশটির সেনাবাহিনীকেও গড়ে তোলা হয় ধর্মনিরপেক্ষতার আদলে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠতাও তুরস্কের। ইসরাইলের সঙ্গে একসময় যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নিলেও তুরস্কের এখন বিশাল পরিবর্তন হয়েছে। ২০০২ সালে এরদোগানের জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টে পার্টি ক্ষমতায় আসার পর তুরস্কের সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক পরিচয় আবারও ইসলামী আদর্শের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে।

মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক পুনরায় জাগিয়ে তোলেন তিনি। তুরস্কের অর্থনীতির স্বার্থে আরব দেশগুলোর সঙ্গেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা করেছেন তিনি। বর্তমানে তুরস্কের সেনাবাহিনী পুরোপুরি বেসামরিক নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

প্রেসিডেন্ট এরদোগান প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। তবে বিভিন্নভাবে সম্পর্ক ঠিক রাখতে চেষ্টা করেন তিনি। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকেও স’ন্ত্রাসী দেশের নেতা ও চোর হিসেবে আখ্যায়িত করেন এরদোগান।

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলের অবরোধ ও নি’র্যাতনের বিষয়ে সবসময় সোচ্চার থাকতে চেষ্টা করেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। তা ছাড়া রোহিঙ্গা ইস্যুসহ বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে মুসলিম নি’র্যাতনের বিষয়ে তাকেই কথা বলতে দেখা যায়।

মুলত এরদোগানের জনপ্রিয়তার ম‚ল রহস্যটি এখানেই। বৈশ্বিকভাবে যখন মুসলমানদের পক্ষে শক্তভাবে কথা বলার প্রয়োজন হয়, এরদোগানকেই তখন এগিয়ে আসতে দেখা যায়। স¤প্রতি নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে ভয়াবহ হা’মলা ও মিসরের মুরসির মৃ’ত্যুর পর এরদোগানকেই অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে।

পর্যবেক্ষক মারওয়ান মুয়াশের মনে করেন, এরদোগানের ইসরাইলবিরোধী অবস্থান ফিলিস্তিন ও জর্ডানে তার ভক্ত বাড়িয়েছে। তিনি বলেন, এরদোগানকে দেখা হয় এমন এক ব্যক্তি হিসেবে যিনি ইসরাইল ও আমেরিকার সামনে দাঁড়িয়েছেন এবং নিজ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন করেছেন। এরদোগানের উঠে আসার গল্প তুরস্কের বহু মানুষকে আন্দোলিত করে।

একটি ধার্মিক পরিবারে জন্ম নেয়া এরদোগান তুরস্কের ধর্মনিরপেক্ষ শাসকগোষ্ঠীকে চ্যালেঞ্জ করেছেন এবং তুরস্কের নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের পক্ষে কথা বলেছেন। তা ছাড়া সুদানের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশিরের শাসনামলে দেশটি যখন আন্তর্জাতিক স¤প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল, তখন দেশটিতে তুরস্ক বিনিয়োগ করেছিল। এ জন্য সুদানের মানুষ তার কাছে কৃতজ্ঞ।