বিশ্বজুড়ে প্রাণহানি লাখ ছাড়াল

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসে (কোভিড ১৯) প্রাণহানির সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। আর শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়েছে সাড়ে ১৬ লাখ। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির রাত সাড়ে ১১টার দিকে হালনাগাদ তথ্যে এ কথা জানিয়েছে।

চলমান বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত বেশির ভাগ দেশ। দ্রুত বেড়ে চলেছে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা। গত ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের উহানে এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে বিশ্বের ১৮৫টি দেশ ও অঞ্চলে এর বিস্তার ঘটেছে।

জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে মারা গেছেন এক লাখ ৩৭৬ জন। আর শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১৬ লাখ ৫০ হাজার ২১০ জন। সুস্থ হয়েছেন ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৬৬৯ জন।
করোনাভাইরাস চীন থেকে সরে এখন ইউরোপের দেশগুলোতে শিকড় গেড়েছে। তবে প্রাণহানি ও রোগী শনাক্তের সংখ্যায় এটি ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রকট আকার ধারণ করছে। যুক্তরাষ্ট্রে শুক্রবার পর্যন্ত ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৭৪৯ রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ১৬ হাজারেরও বেশি।

তবে মৃতের সংখ্যায় প্রথম দুটি দেশই ইউরোপের। সবার ওপরে আছে ইতালি। সেখানে প্রাণহানি ঘটেছে অন্তত ১৮ হাজার ৮৪৯ জনের। তবে ইতালিতে মৃতের সংখ্যা দিন দিন কমছে। দেশটিতে শনাক্ত রোগী প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার। দেশটিতে এখন পর্যন্ত এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হয়েছেন সাড়ে ২৮ হাজারের মতো মানুষ।

ইউরোপে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ইতালির পরই বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে স্পেনে। দেশটিতে শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত মারা গেছেন ১৫ হাজার ৯৭০ জন, আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ৫৭ হাজারের বেশি। দেশটিতে সুস্থ হয়েছেন ৫৫ হাজারের কিছু বেশি। স্পেনেও মৃত ও আক্রান্তের সংখ্যা গত দুদিনের তুলনায় শুক্রবার অনেকটা কমে এসেছে।

ইউরোপের আরেক দেশ ফ্রান্সে এখন পর্যন্ত ১২ হাজার ২১০ ব্যক্তি মারা গেছেন, আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ১৯ হাজারের মতো। এখন পর্যন্ত দেশটিতে সুস্থ হয়েছেন সাড়ে ২৩ হাজার জন।

যুক্তরাজ্যে আক্রান্ত হয়েছেন ৭১ হাজারের বেশি, দেশটিতে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন প্রায় ৯ হাজার জন। জার্মানিতে এখন পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজারের মতো, এর মধ্যে মারা গেছেন ২৬০৭ জন।

এখন পর্যন্ত ইরানে আক্রান্ত হয়েছেন ৬৮ হাজারের কিছু বেশি মানুষ, আর মারা গেছেন ৪ হাজার ২৩২ জন।

যে চীনের করোনাভাইরাসে উৎপত্তি সেখানে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ৮৩ হাজার জন, মারা গেছেন ৩ হাজার ৩৪০ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় চীনে একজন মানুষ মারা গেছেন।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২৭ জন। মোট শনাক্ত ৪২৪। সুস্থ হয়েছে ৩৩ জন।

আল্লাহই রক্ষা করতে পারেন, সুস্থতা দানের মালিক একমাত্র আল্লাহ

মুফতি মুহাম্মাদ ইসমাঈল : রোগে আক্রান্ত হওয়া, অভাবে পতিত হওয়া, ঋণগ্রস্ত হওয়া ও বেকার হওয়াসহ হাজারো পেরেশানিতে মানুষ ভোগে। এ পেরেশানি দুই ধরনের—

এক. পেরেশানি আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তিস্বরূপ এসে থাকে। পাপ-নাফরমানির প্রকৃত শাস্তি তো বান্দা পরকালেই পাবে। কিন্তু মানুষ যখন সীমাহীন অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়, তখন আল্লাহ ইহকালেও আজাবের কিছু নমুনা প্রকাশ করে দেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘(পরকালের) বড় শাস্তির পূর্বে আমি অবশ্যই তাদের (ইহকালে) সামান্য শাস্তি আস্বাদন করাব, যেন তারা (মন্দ কাজ থেকে) প্রত্যাবর্তন করে।’ (সুরা : সাজদা, আয়াত : ২১)

দুই. পেরেশানির মাধ্যমে বান্দার মর্যাদা উন্নীত হতে থাকে। এর বিনিময়ে তাকে সওয়াব দেওয়া হয়, নৈকট্যশীল করা হয়। পেরেশানি শাস্তিস্বরূপ, নাকি কল্যাণময় বুঝব কিভাবে?
রোগ-ব্যা’ধিসহ নানাবিধ পেরেশানিতে পতিত হয়ে কিছু মানুষ আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়া ছেড়ে দেয়। অ’ভিযোগ করে এবং বলে—(নাউজু বিল্লাহ) এ রোগব্যা’ধি ও পেরেশানির জন্য আমিই বাকি ছিলাম? আমাকে কেন রোগব্যা’ধি দেওয়া হচ্ছে? আমার ওপরই এত পেরেশানি কেন? এবং আল্লাহর প্রদত্ত হুকুম-আহকাম পরিত্যাগ করে। আগে নামাজ পড়ত, এখন নামাজ পড়ে না। আগে জিকির-আজকার করত, এখন করে না। পেরেশানি থেকে বাঁচার জন্য দুনিয়াবি সব উপকরণ অবলম্বন করে। কিন্তু আল্লাহর কাছে তাওবা-ইস্তিগফার করে না, দোয়া করে না। বুঝতে হবে, এ পেরেশানি তাদের ওপর শাস্তিস্বরূপ এসেছিল।

আবার কিছু মানুষ রোগব্যা’ধিসহ নানাবিধ পেরেশানিতে পতিত হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর দিকে ধাবিত হয়। কোনোরূপ অ’ভিযোগ করে না; বরং দোয়া করে—হে আল্লাহ আমি দুর্বল, এ রোগব্যা’ধি ও পেরেশানির কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই, অনুগ্রহ করে আমাকে এর থেকে নাজাত দিন। অসুস্থতার নিয়ামতকে সুস্থতার নিয়ামতে পরিণত করে দিন। এবং ইবাদতের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। নাফরমানি ছেড়ে দেয়। বুঝতে হবে, এ পেরেশানি তাদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য, তাদের সওয়াব দেওয়ার জন্য ও আরো নৈকট্যশীল করার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছিল। ইরশাদ হয়েছে, ‘অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জীবনের ক্ষতি এবং ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাব।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫৫-১৫৬)

সুস্থতা বিরাট নিয়ামত
সুস্থতা আল্লাহর এক বিরাট নিয়ামত। ব্যক্তি ও জাতির উন্নতির জন্য সুস্থতা জরুরি। সুখী ও সক্রিয় জীবনযাপনের জন্য সুস্বাস্থ্য আবশ্যক। অসুস্থ ব্যক্তির কোনো কিছুই ভালো লাগে না। প্রবাদ আছে, ‘সুস্থতাই সব সুখের মূল’। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘অসুস্থতার আগে সুস্থতাকে গণিমত মনে করো।’ আরেক হাদিসে আছে, ‘দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অসংখ্য মানুষ প্রতারিত। সুস্থতা ও অবসর।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪১২)

ইসলামে স্বাস্থ্য পরিচর্যার তাগিদ
ইসলাম স্বাস্থ্য পরিচর্যার তাগিদ দিয়েছে। স্বাস্থ্য রক্ষার নানামুখী গাইডলাইন দিয়েছে। স্বাস্থ্য পরিচর্যার দুটি মৌলিক দিক রয়েছে। প্র’তিরোধমূলক ও প্রতিষে’ধকমূলক। এ দুটির ব্যাপারেই ইসলামের মৌলিক নির্দেশনা রয়েছে। স্বাস্থ্য রক্ষা ও সুস্থতার জন্য প্র’তিরোধমূলক বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে— পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, প্রয়োজনীয় পানাহার ও বিশ্রামসহ স্বাস্থ্যবিষয়ক যাবতীয় সতর্কতা অবলম্বন। আর প্র’তিষেধকমূলক ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে—উপযুক্ত চিকিৎসা ও সেবা-শুশ্রূষা ইত্যাদি।

সুস্থতা দানের মালিক একমাত্র আল্লাহ
ছোট-বড় কত রোগে মানুষ আ’ক্রা’ন্ত হয়। সুন্নত হিসেবে ডাক্তারের কাছে যায়। ওষুধ সেবন করে। কিন্তু ডাক্তার বা ওষুধ শেফা দিতে পারে না, শেফা দেন একমাত্র আল্লাহ। কেননা একই ওষুধ, একই অসুস্থতা। একজন সুস্থ হয়, আরেকজন সুস্থ হয় না। একজনের জন্য ওষুধ কার্যকর হয়, আরেকজনের জন্য কার্যকর হয় না। বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা এ কথাও বলে থাকেন, একজন রোগীকে কোনো অসুস্থতার কারণে এক ধরনের ওষুধ দেওয়া হয়, সে সুস্থও হয়। ছয় মাস পর সে আবার একই রোগে আ’ক্রা’ন্ত হয়, তাকে আবার সেই ওষুধই দেওয়া হয়। কিন্তু এবার সে সুস্থ হয় না, ওষুধ কাজ করে না। কেন হয় না? কারণ—এ ওষুধ তার শরীরের জন্য ফিট নয় এবং তাতে আল্লাহর হুকুম নেই, তাঁর ইচ্ছা নেই। ইরশাদ হয়েছে, ‘যদি আল্লাহ তোমাকে কোনো দুর্দশা দ্বারা স্পর্শ করেন, তবে তিনি ছাড়া তা দূরকারী কেউ নেই।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৭)

কোরআনে ইবরাহিম (আ.)-এর কথা বর্ণিত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন আমি অসুস্থ হই তখন তিনিই আমাকে সুস্থতা দান করেন।’ (সুরা : শুআরা, আয়াত : ৮০)

তাই কোনো রোগব্যাধি আ’ক্র’মণ করলে আরোগ্য লাভের জন্য আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইতে হবে। যদিও সুন্নত হিসেবে চিকিৎসাও চালিয়ে যেতে হবে। দোয়া এবং দাওয়া দুটিই জরুরি। তবে ঈমানদারের জন্য আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা এবং তাঁর কাছে সাহায্য চাওয়া সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। মহান আল্লাহ সবাইকে আজাব ও গজব থেকে হেফাজতে রাখুন।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আম্বরশাহ আল ইসলামিয়া, কারওয়ান বাজার, ঢাকা।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.