কীভাবে বুঝেছিলেন, কী করেছিলেন করোনায় আক্রান্ত এই ৯ জন

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নয়জন ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, করোনায় আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে জ্বর আর কাশির মাধ্যমে। জ্বরের মাত্রা ছিল ১০০ থেকে ১০৪ ডিগ্রির মধ্যে। ওষুধ খাওয়ার পরও জ্বর, কাশি না কমায় ঢাকার করোনাভাইরাস শনাক্তের পরীক্ষাকেন্দ্রে হাজির হন তাঁরা। পরীক্ষায় ধরা পড়ে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি।

প্রথম আলোর সঙ্গে আক্রান্ত সাতজন টেলিফোনে কথা বলেছেন। আর দুজনের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। কথা বলা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নয়জনের ছয়জন ঢাকার, দুজন নারায়ণগঞ্জ এবং একজন নরসিংদীর বাসিন্দা। তাঁদের একজন মসজিদের ইমাম, ছয়জন ব্যবসায়ী আর দুজন শ্রমিক।
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নয়জনের একজন মারা গেছেন গত বুধবার। দুজন হাসপাতালে আছেন। বাকি ছয়জন চিকিৎসকের পরামর্শে বর্তমানে বাসায় কোয়ারেন্টিনে আছেন।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ, পরবর্তীকালে আক্রান্ত হওয়ার পর কীভাবে কাটছে তাঁদের জীবন এবং কেমন আছেন তাঁরা?
বয়স ৩২, ঢাকা

আমি ঢাকার রমনা এলাকায় থাকি। ঢাকার একটি মসজিদের ইমাম। এক সপ্তাহ ধরে আমার জ্বর ও কাশি ছিল। ডাক্তারের দেওয়া প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ খাচ্ছিলাম। ওষুধ খাই কিন্তু জ্বর কমে না। পরে খাইলাম অ্যান্টিবায়োটিক। তাতে আমার কোনো উন্নতি হয় না। পরে আমি গত মঙ্গলবার আসি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ফিভার ক্লিনিকে। মোটরসাইকেলে করে আমি সেখানে আসি। ডাক্তার আমার চেকআপ করলেন। আজ বুধবার সকাল ১০টায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাকে ফোন দিয়ে বলে, ‘আমার করোনা পজিটিভ।’ এরপর আমার সঙ্গে পুলিশ যোগাযোগ করে। বুধবার জোহরের নামাজ আমি পড়াইনি। তবে আসরের নামাজ আমি পড়িয়েছিলাম। শরীর খারাপ হওয়ায় কয়েক দিন ধরে আমি বাসায় যাই না। বুধবার আমি সকাল নয়টার সময় বাসায় এসেছি। আমার বাসায় স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে আছে।

আমি যে মসজিদে ইমামতি করি, সেটা বেশ বড় মসজিদ। সবাইকে ওভারটেক করে আমাকে সামনের দিকে যেতে হয়। যে লোক এই রোগে আক্রান্ত, তিনিও আমার মসজিদে আসতে পারেন নামাজ আদায় করতে। আইইডিসিআরের (সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান) থেকে আমাকে দুটি হাসপাতালের (কুর্মিটোলা হাসপাতাল ও কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতাল) দুটি নম্বর দিয়েছে এবং বলে দিয়েছে, যদি আমার শরীর আরও খারাপ হয়, তাহলে আমি যেন হাসপাতালের ওই দুটি নম্বরে যোগাযোগ করি।

শ্রমিক, বয়স ৩২, নরসিংদী
আমার প্রথম দুই দিন জ্বর এসেছিল। জ্বর ছিল ১০২ ডিগ্রি। গলাব্যথা ছিল। ছিল কাশি। নাপা, হিস্টাসিন খাই। লকডাউন করে দেওয়ার পর আমাদের কোম্পানিও ছুটি দেয়। আমি নারায়ণগঞ্জের একটি মেসে থাকি। ছুটি পাওয়ার পর আমি বাড়িতে চলে আসি। পরে আমি নরসিংদীতে গ্রামের বাড়িতে চলে আসি। গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পরও আমার কাশি ছিল। আমি টেস্ট করাই ৪ এপ্রিল। পরে আমার পরিবারের বাকি সদস্যদের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এখন আমি নরসিংদীর একটি হাসপাতালে আছি।

শ্রমিক, বয়স ৫০, নারায়ণগঞ্জ
আমার বাড়ি নারায়ণগঞ্জে। কয়েক দিন আগে আমার জ্বর হয়। এর সঙ্গে অল্প কাশি ছিল। জ্বর কিন্তু ১০০ ডিগ্রির ওপরে ছিল না। শরীরটা ক্লান্ত লাগছিল। তখন আমি ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করি। ডাক্তার আমাকে বললেন, ‘আপনি নিউমোনিয়ার টেস্টটা করান। এক্স-রে করে নিয়ে আসেন।’ পরে আমি এক্স-রে করিয়ে নিয়ে আসি। রিপোর্ট দেখে ডাক্তার আমাকে বললেন, ‘আপনার নিউমোনিয়া আছে।’ তখন ওই ডাক্তার আমাকে বললেন, ‘যেহেতু আপনার নিউমোনিয়ার লক্ষণ আছে, তাই করোনাভাইরাসের টেস্টটা করান।’ তখন আমি করোনাভাইরাসের টেস্ট করাই। টেস্টে আমার করোনা পজিটিভ এসেছে। ৪ এপ্রিল থেকে এখন আমি উত্তরার কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে আছি। হাসপাতালে এখন আমি ভালো আছি।

ব্যবসায়ী, বয়স ৩২ বছর, পুরান ঢাকা
আমি পুরান ঢাকা এলাকায় বসবাস করি। গত ২৫ মার্চ থেকে আমি বাসায় ছিলাম। ২৭ মার্চ আমার জ্বর আসে। জ্বর সর্বোচ্চ ১০২ ডিগ্রি পর্যন্ত ওঠে। এখনো আমার শরীরে অল্প জ্বর আছে। জ্বর হওয়ার চার থেকে পাঁচ দিন পর হালকা কাশি শুরু হয়। কাশিটা শুকনা। কফ নাই। গলাব্যথা ছিল না। আমার জ্বর কোনোভাবে কমছিল না। তখন ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে যাই। সেখানকার ডাক্তার আমাকে করোনার পরীক্ষা করাতে বলেন। পরে মঙ্গলবার আমি শাহবাগের বিএসএমএমইউতে করোনার পরীক্ষা করাতে আসি। আমার করোনা পজিটিভ এসেছে। আমি এখন বাসায় আছি। আমি ব্যবসা করি। আমার মোবাইল ফোনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কামরাঙ্গীরচরে। আমার বাসা সম্পূর্ণ লকডাউন করে দেওয়া হয়েছে। আমি থাকি পাঁচতলা বাসায়।

ব্যবসায়ী, বয়স ৪৫, পুরান ঢাকা
আমি ব্যবসা করি। দোকান পুরান ঢাকায়। গত ২৬ মার্চ তারিখে লকডাউন শুরু হওয়ার পর আর দোকান খুলি না। আমার ডায়াবেটিস আছে। চোখে আছে সমস্যা। তখন আমি চোখের ডাক্তারের কাছে যাই। পরে ঢাকার একটা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আমার চোখের পরীক্ষা হয়। সেদিন রাতে আমার একটু জ্বর আসে। একটু কাশি হয়। পরে আমি করোনাভাইরাসের পরীক্ষা করাই। আমার করোনা পজিটিভ এসেছে। আমি পাঁচতলায় থাকি। আমার জ্বর হওয়ার পর থেকে আমি আমার স্ত্রী-সন্তান থেকে আলাদা কক্ষে থাকি। আমার বাসার তিনটা রুম। আমার রুমে কেউ আসে না। শুধু আমার খাবারটা দরজার গোড়ায় পৌঁছে দিয়ে যায়। আমার বাথরুম আলাদা আছে। আমার স্ত্রী, আমার দুই ছেলে, এক মেয়ে। তাদেরও নমুনা নিয়ে গেছে আইইডিসিআর। আমাদের বাসার কেউ বাইরে যায় না।

বয়স ৬৭ বছর, পুরান ঢাকা
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত লোকটির বয়স ৬৭ বছর। তাঁর একমাত্র ছেলের সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর।
তিনি বলেন, ‘আমার বাবার বয়স ৬৭ বছর। আমি বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। আমার বাবা মসজিদে নামাজ পড়তে যেতেন। মহল্লায় হাঁটাহাঁটি করতেন। কয়েক দিন আগে আমার বাবার জ্বর হয়। এর সঙ্গে কাশি শুরু হয়। পরে বাবাকে নিয়ে করোনার পরীক্ষা করাই। তাতে ধরা পড়ে করোনা পজিটিভ। এখন আমার বাবা বাসায় আছেন। দুই দিন আগে থেকে বাবা আলাদা কক্ষে থাকেন। তাঁর খাবার দিয়ে আসা হয়। বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। প্রশাসন আমাদের বাসা লকডাউন করে দিয়েছে।’

বয়স ৫৫ বছর, নারায়ণগঞ্জ
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে বুধবার মারা গেছেন নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী। তাঁর বয়স ৫৫ বছর। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া নিয়ে তাঁর ছেলে বলেন, ‘আমার বাবা বুধবার বেলা ১১টায় মারা গেছেন। আব্বু ব্যবসা করতেন। কয়েক দিন আগে আব্বুর জ্বর আসে। জ্বর আসার দুই থেকে তিন দিন পর কাশি শুরু হয়। কাশিটা ছিল শুকনা। এর দুই থেকে তিন দিন পর আব্বুর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়ার পর ভাবলাম, আর দেরি করা যাবে না। কিন্তু ২৬ মার্চ শুরু হলো লকডাউন। আমাদের পরিচিত একজন ডাক্তার ছিল, তার সঙ্গে ফোনেই সব কথা বললাম। ওই ডাক্তার যে ওষুধ দিলেন, তা আব্বুকে খাওয়ালাম। ওষুধ খাওয়ানোর পরও আব্বুর জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট কমে না। তারপর আমি আব্বুকে নিয়ে গেলাম নারায়ণগঞ্জের সিটি হাসপাতালে। সিটি হাসপাতালে দুইটা পরীক্ষা করালাম। পরে আব্বুকে নিয়ে বাসায় যাই। দেখলাম, আব্বুর অবস্থা আরও খারাপ। তখন নারায়ণগঞ্জের কোনো হাসপাতাল শ্বাসকষ্টের রোগী ভর্তি নেয় না। অনেক চেষ্টা করেছিলাম আব্বুকে ভর্তি করাইতে কিন্তু নেয়নি কেউ। গত ৩১ মার্চ থেকে আব্বুর অবস্থা খারাপ। নারায়ণগঞ্জ থেকে অ্যাম্বুলেন্স পাইনি। আব্বুকে নিয়ে ঢাকায় এসেছি একটা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে। বুধবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) টেস্ট করাই। আব্বুর ব্লাড পেশার বেশি ছিল। ডায়াবেটিসও ছিল অনেক। পরে আব্বুকে ঢাকার আরেকটি হাসপাতালে নিয়ে আসি। পরে ওই হাসপাতাল আব্বুকে ভর্তি করে। সারা রাত আব্বুর শ্বাসকষ্ট হয়। বুধবার বেলা ১১টায় আব্বুর অবস্থা অনেক খারাপ হয়ে যায়। আব্বু মারা গেলেন। আমরা তিন ভাই–বোন।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.