যারা ত্রাণ চুরি করেছে তারা জাতীয় গাদ্দার, এরা মানুষ নামের পশু : চরমোনাই পীর

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর মুফতী রেজাউল করীম (চরমোনাই পীর) বলেছেন, করোনা মহামারীতে সারাদেশে সাধারণ ছুটি থাকায় দরিদ্র অসহায় ও মধ্যবিত্তের মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে।

সেই অসহায় মানুষের ত্রাণ নিয়ে সরকারদলীয় নেতাদের দুর্নীতি সহ্য করা যায় না। যারা জাতির এমন দুর্দিনেও ত্রাণ চুরি করে, যারা অসহায় মানুষের মুখের আহার কেড়ে নেয়, তারা জাতীয় গাদ্দার, তারা মানুষ নামের পশু এদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

রবিবার (১২ এপ্রিল) এক বিবৃতিতে চরমোনাই পীর এসব কথা বলেন।

চরমোনাই পীর বলেন, তারা দলীয় বিবেচনায় ত্রাণ দিচ্ছে, ফলে অনেক অসহায় ও মধ্যবিত্তের মানুষ ত্রাণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সরকারি ত্রাণ নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের হরিলুট অবস্থা বিশ্বে বাংলাদেশকে কলঙ্কিত করছে। তিনি বলেন, চাল চোরদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিন। ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই জেল দিন।

চরমোনাই পীর বলেন, সুষ্ঠুভাবে ত্রাণ বিতরণের জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও ডিসির নেতৃত্বে সর্বদলীয় ত্রাণ সমন্বয়ন কমিটি গঠন করে, তাদের মাধ্যমে তালিকা প্রস্তুত করে ত্রাণ বিতরণ করলে আশা করা যায় অসহায় ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছবে।

বাসায় ১১ মাসের দুধের সন্তান রেখে হাসপাতালে করোনা রোগীদের সেবা দিচ্ছেন ডা.আশা

নাটোর সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আয়শা সিদ্দিকা আশা। আউটডোর মেডিকেল অফিসার হিসেবে গাইনি বিভাগে রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতেন। বর্তমানে দেশের এই পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে নিয়মিত করোনা কেয়ারের রোগীদের সেবা দিচ্ছেন তিনি। দুধের সন্তানদের বাসায় রেখে রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত হাসপাতালে ছুটে যান হাসপাতালে।

ডা. আয়শা সিদ্দিকা আশার দুই সন্তান। বড় সন্তানের বয়স ৩ বছর আর ছোট সন্তানের বয়স ১১ মাস। দুটি সন্তানই অসুস্থ। তারপরেও তাদের বাসায় রেখে হাসপাতালে রোগী দেখতে যান আশা। নাটোরের এই চিকিৎসক দুই সন্তানসহ পরিবারের জন্য দোয়া চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন।

নাটোর সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা একজন সেবাগ্রহীতা ইয়াসিনপুর কলেজের অধ্যক্ষ সাজেদুর রহমান বলেন, বমর্তমান এই সময়ে ভয়ে অনেক চিকিৎসক হাসপাতালে আসছেন না। কিন্তু ডাক্তার আশা অসুস্থ দুই সন্তানকে বাসায় রেখে করোনা ইউনিটে আসা রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি তার এই মমত্ববোধ সত্যিই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বলে মনে করেন তিনি।

ডা. আয়শা সিদ্দিকা আশা জানান, ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি সকলের মঙ্গলকামনা করে অসুস্থ দুই সন্তানের জন্য সকলের কাছে দোয়া চেয়েছেন। চলমান এই পরিস্থিতিতে কোন ভাবে কর্তব্যের অবহেলা করার সুযোগ নেই। তিনি নিজে যতক্ষণ সুস্থ থাকবেন করোনা ইউনিটের রোগীদের সেবা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে নাটোরের সিভিল সার্জন ডা. মিজানুর রহমান বলেন, চিকিৎসকদের যতটা সম্ভব নিরাপত্তার মধ্যে থেকে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন। নাটোরে করোনা উপসর্গ বেশ কিছু রোগী পেয়েছি। সদর হাসপাতালের করোনা আইসোলেশনেও রেখেও রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত জেলায় ১৭ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এদের মধ্যে কেউ করোনায় আক্রান্ত হননি।

একটা পয়সাও হাতে নেই, চারদিন ধরে শুধু পানি খেয়ে বেঁচে আছি !

রোববার কারফিউ লাগার আগের দিন মালিক কিছু টাকা দিয়েছিল। তা দিয়ে তিন চার দিন খেয়েছি। তারপর থেকে আমরা কয়েকশো বাঙালী শ্রমিক শুধু নলের পানি খেয়ে থাকছি। একটাও পয়সা নেই হাতে।

কোনও মতে পেটে গামছা বেঁধে রয়েছি। সবাইকে মিনতি করছি, একটু আমাদের কথাটা ভাবুন,’ বলছিলেন গুজরাটের সুরাট শহরে কাজ করতে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের এক শ্রমিক মুহম্মদ সেকেন্দার শেখ। মাস তিনেক হল পূর্ব বর্ধমান থেকে সুরাটে এম্ব্রয়ডারির কাজ করতে গেছেন মি. শেখ।

ভারতে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে যখন লকডাউন চলছে, তার মধ্যেই এক মানবিক সঙ্কটের দিকে দেশটি এগোচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে। দিল্লি, মুম্বাই, গুজরাট বা দক্ষিণ ভারতে কাজ করতে যাওয়া কয়েক লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক সেইসব জায়গায় আটকে পড়েছেন।

কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারগুলি তাদের আর্থিক অনুদান এবং খাদ্যদ্রব্য সরবরাহের বিষয়ে আশ্বস্ত করলেও সেসব সাহায্য তাদের কাছে এখনও পৌঁছায়নি। সপ্তাহান্তে দিল্লির একটি আন্তরাজ্য বাস টার্মিনালের ছবি বহু মানুষই দেখেছেন — কয়েক লক্ষ মানুষের ভিড় সেখানে, লকডাউনের পরে তারা নিজের নিজের গ্রামে ফেরার চেষ্টা করছেন।

বহু মানুষ পায়ে হেঁটেই পাঁচ, ছয় বা সাতশো কিলোমিটার দূরে নিজের গ্রামে যাওয়ার জন্য রওনা হয়েছেন স্ত্রী সন্তানদের হাত ধরে। অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে আশঙ্কা প্রকাশ করছিলেন যে এই কয়েক লক্ষ মানুষ নিজেদের গ্রামে ফিরে যেতে গিয়ে সারা দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে দেবেন।

কিন্তু তারা বাধ্য হচ্ছিলেন পায়ে হেঁটে শয়ে শয়ে কিলোমিটার পাড়ি দিতে – কারণ এদের কাজ বন্ধ, তাই খাবারের সংস্থান অনিশ্চিত। গ্রামে ফিরলে অন্তত ঘরভাড়া গুনতে হবে না, আর কোনও মতে খাবার ঠিকই জুটে যাবে – এমনটাই ভেবেছিলেন এরা। যদিও দিন কয়েক পরে সরকার ওইসব পরিযায়ী শ্রমিকদের দিল্লি ত্যাগ আটকাতে পেরেছেন।

তবে লকডাউন শুরু হওয়ার আগেই অনেকে ফিরে এসেছেন গ্রামের বাড়িতে। চেন্নাইতে কাজ করতে গিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার একদল শ্রমিক। সারা দেশে লকডাউন হয়ে যেতে পারে, এমন একটা আশঙ্কা করে ২২ তারিখের জনতা কারফিউয়ের আগেই তারা ট্রেন ধরেছিলেন বাড়ির উদ্দেশ্যে।

কোনও মতে বাড়ি ফিরতে পেরেছিলেন, কিন্তু যেহেতু ভিন রাজ্য থেকে এসেছেন, তাই ডাক্তার তাদের বাড়িতেই কোয়ারেন্টিনে থাকার উপদেশ দিয়েছিলেন। ‘আমাদের বাড়ির অবস্থা এমন নয় যে আলাদা ঘরে থাকতে পারব। আবার এই পরিস্থিতিতে গ্রামের মানুষ বা পরিবারের অন্যদের কোনও বিপদ হোক তাও চাই নি।

তাই গ্রামের বাইরে একটা বড় গাছে মাচা বেঁধে আমরা সাতজন থাকছিলাম। দিন ছয়েক ওইভাবেই ছিলাম। গ্রাম থেকে খাবার দিয়ে যেত। সংবাদ প্রচার হতে সরকারি কর্মকর্তারা জানতে পারেন। তারা এখন একটা শিশু বিকাশ কেন্দ্রতে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

পানি, খাবার – সব সরকারই দিচ্ছে,’ বলছিলেন দিন ছয়েক মাচা বেঁধে গাছের ওপরে আশ্রয় নেওয় এক পরিযায়ী শ্রমিক বিজয় সিং লায়া। ব্যাঙ্গালোরেও কয়েক লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক থাকেন। পশ্চিমবঙ্গের বহু নারীও সেখানে গৃহকর্মী হিসাবে কাজ করেন। ব্যাঙ্গালোরের বাসিন্দা মিজ রোজি, যিনি শুধুই তার নাম ব্যবহার করেন, পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে গবেষণা করেন।

সেই সূত্রেই পরিযায়ী শ্রমিকেদের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে। মিজ রোজি জানাচ্ছিলেন,‘প্রতিদিন আমাদের কাছে ৮০ থেকে ১০০-রও বেশি ফোন আসছে। সবাই বলছে তাদের হাতে পয়সা নেই, খাবার নেই, এমনকি জল কেনারও পয়সা নেই। অনেক জায়গাতেই জল কিনে খেতে হয়। যারা গৃহকর্মে যুক্ত আছেন, সেই সব নারী যেখানে কাজ করেন, সেখানে গিয়ে বেতন আনতে পারছেন না।

আবার যারা নির্মান কাজে যুক্ত, তাদের নির্মানস্থলেই অস্থায়ী ছাউনি বানিয়ে রাখা হয়। লকডাউনের ফলে এরা সকলেই আটকে পড়েছেন।’ মিজ রোজি এবং আরও বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সরকারি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন – শ্রমিক মহল্লাগুলিতে খাবার পাঠানোর জন্য। সারা দেশেই কয়েক লক্ষ শ্রমিক এই লকডাউনের ফলে আটকে রয়েছেন। খুব কম মানুষই আগে বাড়ি চলে আসতে পেরেছিলেন।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ রুখতে গিয়ে একটা বড় মানবিক সঙ্কট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কার্স সলিডারিটি নামের একটি সংগঠনের নেতা রাতুল ব্যানার্জী। ‘সরকার বলেছে ঠিকই যে এদের কাছে আর্থিক অনুদান, খাদ্যশস্য পৌঁছানো হবে। কিন্তু সেটা ঠিক কীভাবে হবে, তার কোনও দিশা কিন্তু এখনও নেই।

আমাদের নেটওয়ার্কের সবার কাছে অসংখ্য ফোন আসছে, ফেসবুকে পোস্ট করছেন অনেকে নিজেদের দুরবস্থা জানিয়ে। আমরা সেই সব এলাকার স্থানীয় প্রশাসনের কাছে সেই বার্তা পৌঁছিয়ে দিচ্ছি।’ ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে পায়ে হেঁটে কয়েকশো কিলোমিটার পাড়ি দিতে গিয়ে ইতিমধ্যেই দু’জন মারা গেছেন।

মি. ব্যানার্জীর মতো সামাজিক কর্মকর্তারা বলছেন দ্রুত যদি এই শ্রেণীর মানুষের কাছে খাবার, খাবার পানীয়, চিকিৎসার ব্যবস্থা আর কিছু অর্থ সাহায্য না পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে এরা রাস্তায় বেরোতে বাধ্য হবেন খাবারের খোঁজে, আর তখন লকডাউনের মূল উদ্দেশ্যটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.