উপবৃত্তির জমানো টাকা দিয়ে ২০০ মানুষকে খাবার দিল স্কুল ছাত্রী সিনথিয়া

করোনা ভাইরাস পরি’স্থিতিতে নেত্রকোনা সদর উপজেলার কর্মহীন ২০০ শ্রমজীবী মানুষের খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সিনথিয়া। নিজের উপবৃত্তির জমানো টাকা দিয়ে উপজেলার সিংহের বাংলা ইউনিয়নের কান্দুলিয়া গ্রামের খেটে খাওয়াদের মাঝে আলু ডাল তেল লবণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করে ওই শিশু শিক্ষার্থী।

স্থানীয়রা জানায়, নেত্রকোনা সদর উপজেলার কান্দুলিয়া গ্রামের জুয়েল ভাণ্ডারীর কন্যা সিনথিয়া আক্তার। সে স্থানীয় উচ্চবিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। আশপাশের খেটে খাওয়া মানুষের অভাব অন’টন দেখে তার বাবা জুয়েল ভাণ্ডারীকে বলেন, মানুষের জন্য কিছু করার। বাবা-মায়ের দেয়া জমানো টাকাসহ স্কুলের উপবৃত্তির জমানো টাকায় বাবাকে নিয়ে চাল ডালসহ কিছু ত্রাণসামগ্রী ক্রয় করেন।

স্থানীয় ২০০ জন হ’তদরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষের তালিকা করে তাদের কাছে তা পৌঁছে দেয় সিনথিয়া। ওই গ্রামের আয়েশা খাতুন (৭০) নামে একজন বৃদ্ধা জানান, এমন সময়ে এ ত্রাণ পেয়ে খুবই খুশি। ছোট্ট শিশু যদি ২০০ জনকে ত্রাণ দিতে পারে তাহলে সমাজের বিত্তবানরা কী করে? জনপ্রতিনিধিরা কোথায় আছে।

স্কুলছাত্রী সিনথিয়ার বাবা জুয়েল ভাণ্ডারী বলেন, মেয়ের আবদার করে কিছু টাকা দিতে। এই টাকা দিয়ে সে এমন কাজ করবে ভাবিনি। মানুষ মানুষের জন্য। আর দেশের এমন সময়ে মেয়ের উছিলায় মানুষের জন্য কিছু করতে পেরে আল্লাহর নিকট অনেক শুকরিয়া জানাই। মেয়ের জমানো উপবৃত্তির টাকার সঙ্গে তিনি নিজের হাত থেকে আরও কিছু টাকা যোগ করে ২০০ মানুষের জন্য এ আয়োজন করেন।

কৃষ্ণ গোবিন্দ উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সিনথিয়া আক্তার জানায়, শুধু দেশের নয়, সারা বিশ্বের পরি’স্থিতি এখন ভ’য়াবহ। এ সময় মানুষ খাবারসহ নানারকম দুর্ভো’গে পড়েছে। দেশের সব বিত্তবান মানুষকে অসহায়দের পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধও করেন শিক্ষার্থী সিনথিয়া।

এ বিষয়ে নেত্রকোনার সংরক্ষিত আসনের এমপি হাবিবা রহমান খান শেফালী জানান, সিনথিয়ার কাছ থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। প্রায় সব শিক্ষার্থীই উপবৃত্তির টাকা দিয়ে নিজের জামা কাপড় কিংবা খাতা-কলম কিনতে খরচ করে। সে নিজের জমানো টাকা দিয়ে যে কাজটা করেছে তার কাছ থেকে সবার শিক্ষা নেয়া উচিত।

তিনি বলেন, এই ছোট্ট বাচ্চা একটা মেয়ে যে দৃষ্টা’ন্ত স্থাপন করলো তা দেখে সমাজের বিত্তবানরা উদ্বু’দ্ধ হোক। ভালো থাকুক সিনথিয়া। তার মতোই নতুন প্রজন্মরা এমন আরও ভালো কাজে এগিয়ে আসুক। ওদের হাতেই আসুক ভবিষ্যতের নেতৃত্ব।

গোপনে দান করলে আরশের নিচে ছায়া পাওয়া যাবে কিয়ামতের দিন !

যে ব্যক্তি গোপনে দান-খয়রাত করে, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন সুশীতল ছায়াতলে স্থান দেবেন।

এ ছাড়া আরও ছয় প্রকারের লোককে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাঁর সুশীতল ছায়াতলে স্থান দেবেন। সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবি হযরত আবু হুরাইরা (রা:) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, সাত ধরণের লোককে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাঁর সুশীতল ছায়াতলে স্থান দেবেন।

যে দিন তাঁর ছায়া ব্যতিত আর কোন ছায়াই থাকবেনা। সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তিরা হলেন- ১.ন্যায়বিচারক বা শাসক বা নেতা । ২.মহান আল্লাহর ইবাদতে মশগুল যুবক। ৩.মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তি।

৪.যে দুই ব্যক্তি শুধু মাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষে পরস্পর বন্ধুত্ব করে ও ঐক্যবদ্ধ থাকে এবং এজন্যই তারা আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ৫. এমন পুরুষ, যাকে কোন উচ্চ বংশের সুন্দুরী নারী অসৎ কাজের দিকে ডেকেছে; কিন্তু সে জানিয়ে দিয়েছে, আমি আল্লাহকে ভয় করি।

৬. যে ব্যক্তি এত গোপনে দান-খয়রাত করে যে, তার ডান হাত কি করছে বাম হাতও তা জানতে পারেনি এবং ৭. এমন ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহর যিকির করে এবং দু’ চোখ থেকে পানি ঝরে (ক্রন্দন করে) (বুখারী ও মুসলিম)

প্রসঙ্গত, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, মানবতার মুক্তির দূত, সাইয়্যেদুল মুরসালিন খাতামুননাবিয়ীন হযরত মুহাম্মদ (সা:)কে আল্লাহ ছোবাহানাহু তায়ালা বিশ্ববাসীর জন্য রহমত স্বরূপ এ পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন- তোমাদের জন্য রাসুলের জীবনীর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। তাঁর প্রতিটি কথা, কাজ, অনুমোদন, নির্দেশনা, আদেশ, নিষেধ ও উপদেশ দুনিয়া-আখেরাতের কল্যাণের বার্তাবাহী।

আল্লাহই রক্ষা করতে পারেন, সুস্থতা দানের মালিক একমাত্র আল্লাহ

মুফতি মুহাম্মাদ ইসমাঈল : রোগে আক্রান্ত হওয়া, অভাবে পতিত হওয়া, ঋণগ্রস্ত হওয়া ও বেকার হওয়াসহ হাজারো পেরেশানিতে মানুষ ভোগে। এ পেরেশানি দুই ধরনের—

এক. পেরেশানি আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তিস্বরূপ এসে থাকে। পাপ-নাফরমানির প্রকৃত শাস্তি তো বান্দা পরকালেই পাবে। কিন্তু মানুষ যখন সীমাহীন অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়, তখন আল্লাহ ইহকালেও আজাবের কিছু নমুনা প্রকাশ করে দেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘(পরকালের) বড় শাস্তির পূর্বে আমি অবশ্যই তাদের (ইহকালে) সামান্য শাস্তি আস্বাদন করাব, যেন তারা (মন্দ কাজ থেকে) প্রত্যাবর্তন করে।’ (সুরা : সাজদা, আয়াত : ২১)

দুই. পেরেশানির মাধ্যমে বান্দার মর্যাদা উন্নীত হতে থাকে। এর বিনিময়ে তাকে সওয়াব দেওয়া হয়, নৈকট্যশীল করা হয়। পেরেশানি শাস্তিস্বরূপ, নাকি কল্যাণময় বুঝব কিভাবে?
রোগ-ব্যা’ধিসহ নানাবিধ পেরেশানিতে পতিত হয়ে কিছু মানুষ আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়া ছেড়ে দেয়। অ’ভিযোগ করে এবং বলে—(নাউজু বিল্লাহ) এ রোগব্যা’ধি ও পেরেশানির জন্য আমিই বাকি ছিলাম? আমাকে কেন রোগব্যা’ধি দেওয়া হচ্ছে? আমার ওপরই এত পেরেশানি কেন? এবং আল্লাহর প্রদত্ত হুকুম-আহকাম পরিত্যাগ করে। আগে নামাজ পড়ত, এখন নামাজ পড়ে না। আগে জিকির-আজকার করত, এখন করে না। পেরেশানি থেকে বাঁচার জন্য দুনিয়াবি সব উপকরণ অবলম্বন করে। কিন্তু আল্লাহর কাছে তাওবা-ইস্তিগফার করে না, দোয়া করে না। বুঝতে হবে, এ পেরেশানি তাদের ওপর শাস্তিস্বরূপ এসেছিল।

আবার কিছু মানুষ রোগব্যা’ধিসহ নানাবিধ পেরেশানিতে পতিত হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর দিকে ধাবিত হয়। কোনোরূপ অ’ভিযোগ করে না; বরং দোয়া করে—হে আল্লাহ আমি দুর্বল, এ রোগব্যা’ধি ও পেরেশানির কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই, অনুগ্রহ করে আমাকে এর থেকে নাজাত দিন। অসুস্থতার নিয়ামতকে সুস্থতার নিয়ামতে পরিণত করে দিন। এবং ইবাদতের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। নাফরমানি ছেড়ে দেয়। বুঝতে হবে, এ পেরেশানি তাদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য, তাদের সওয়াব দেওয়ার জন্য ও আরো নৈকট্যশীল করার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছিল। ইরশাদ হয়েছে, ‘অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জীবনের ক্ষতি এবং ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাব।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫৫-১৫৬)

সুস্থতা বিরাট নিয়ামত
সুস্থতা আল্লাহর এক বিরাট নিয়ামত। ব্যক্তি ও জাতির উন্নতির জন্য সুস্থতা জরুরি। সুখী ও সক্রিয় জীবনযাপনের জন্য সুস্বাস্থ্য আবশ্যক। অসুস্থ ব্যক্তির কোনো কিছুই ভালো লাগে না। প্রবাদ আছে, ‘সুস্থতাই সব সুখের মূল’। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘অসুস্থতার আগে সুস্থতাকে গণিমত মনে করো।’ আরেক হাদিসে আছে, ‘দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অসংখ্য মানুষ প্রতারিত। সুস্থতা ও অবসর।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪১২)

ইসলামে স্বাস্থ্য পরিচর্যার তাগিদ
ইসলাম স্বাস্থ্য পরিচর্যার তাগিদ দিয়েছে। স্বাস্থ্য রক্ষার নানামুখী গাইডলাইন দিয়েছে। স্বাস্থ্য পরিচর্যার দুটি মৌলিক দিক রয়েছে। প্র’তিরোধমূলক ও প্রতিষে’ধকমূলক। এ দুটির ব্যাপারেই ইসলামের মৌলিক নির্দেশনা রয়েছে। স্বাস্থ্য রক্ষা ও সুস্থতার জন্য প্র’তিরোধমূলক বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে— পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, প্রয়োজনীয় পানাহার ও বিশ্রামসহ স্বাস্থ্যবিষয়ক যাবতীয় সতর্কতা অবলম্বন। আর প্র’তিষেধকমূলক ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে—উপযুক্ত চিকিৎসা ও সেবা-শুশ্রূষা ইত্যাদি।

সুস্থতা দানের মালিক একমাত্র আল্লাহ
ছোট-বড় কত রোগে মানুষ আ’ক্রা’ন্ত হয়। সুন্নত হিসেবে ডাক্তারের কাছে যায়। ওষুধ সেবন করে। কিন্তু ডাক্তার বা ওষুধ শেফা দিতে পারে না, শেফা দেন একমাত্র আল্লাহ। কেননা একই ওষুধ, একই অসুস্থতা। একজন সুস্থ হয়, আরেকজন সুস্থ হয় না। একজনের জন্য ওষুধ কার্যকর হয়, আরেকজনের জন্য কার্যকর হয় না। বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা এ কথাও বলে থাকেন, একজন রোগীকে কোনো অসুস্থতার কারণে এক ধরনের ওষুধ দেওয়া হয়, সে সুস্থও হয়। ছয় মাস পর সে আবার একই রোগে আ’ক্রা’ন্ত হয়, তাকে আবার সেই ওষুধই দেওয়া হয়। কিন্তু এবার সে সুস্থ হয় না, ওষুধ কাজ করে না। কেন হয় না? কারণ—এ ওষুধ তার শরীরের জন্য ফিট নয় এবং তাতে আল্লাহর হুকুম নেই, তাঁর ইচ্ছা নেই। ইরশাদ হয়েছে, ‘যদি আল্লাহ তোমাকে কোনো দুর্দশা দ্বারা স্পর্শ করেন, তবে তিনি ছাড়া তা দূরকারী কেউ নেই।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৭)

কোরআনে ইবরাহিম (আ.)-এর কথা বর্ণিত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন আমি অসুস্থ হই তখন তিনিই আমাকে সুস্থতা দান করেন।’ (সুরা : শুআরা, আয়াত : ৮০)

তাই কোনো রোগব্যাধি আ’ক্র’মণ করলে আরোগ্য লাভের জন্য আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইতে হবে। যদিও সুন্নত হিসেবে চিকিৎসাও চালিয়ে যেতে হবে। দোয়া এবং দাওয়া দুটিই জরুরি। তবে ঈমানদারের জন্য আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা এবং তাঁর কাছে সাহায্য চাওয়া সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। মহান আল্লাহ সবাইকে আজাব ও গজব থেকে হেফাজতে রাখুন।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আম্বরশাহ আল ইসলামিয়া, কারওয়ান বাজার, ঢাকা।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.