করোনা পরিস্থিতিতে ইসরাইলি কারাগারে ফিলিস্তিনিদের দুঃসহ জীবন

করোনা ভাইরাস যদিও চীনের উহান শহর থেকে শুরু হয়েছে কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যে তা আমেরিকা, ইউরোপসহ সারা বিশ্বে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ইউরোপ মহাদেশ করোনা প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জেলখানায় আটক কারাবন্দিরা। এ কারণে ইরানসহ আরো বহু দেশের জেলখানা থেকে অনেক বন্দিকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে করুণ অবস্থায় রয়েছে দখলদার ইসরাইলের জেলখানায় আটক ফিলিস্তিনি বন্দিরা।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৯৪৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদেরকে গ্রেফতার ও বন্দির সংখ্যা বহুগুণে বেড়েছে। ৪৮ সাল থেকে এ দীর্ঘ সময়ে এ পর্যন্ত প্রায় ১৮টি জেলখানা নির্মাণ করেছে ইসরাইল। ফিলিস্তিনি বন্দি ও শরণার্থী বিষয়ক কমিটির কর্মকর্তা আব্দুন নাসের ফারওয়ানে জানিয়েছেন, বর্তমানে পাঁচ হাজার ৮০০ নারী ও পুরুষ বন্দি ইসরাইলের বিভিন্ন কারাগারে আটক রয়েছে। এসব বন্দির মধ্যে ৫৪০জনকে একবার কিংবা একাধিকবার আজীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। ৫৮০০ বন্দির মধ্যে ৬২ জন নারী এবং ৩০০ জন রয়েছে নির্ধারিত বয়সসীমার নীচে অর্থাৎ শিশু।

ফিলিস্তিনি বন্দি ও শরণার্থী বিষয়ক কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ১৯৬৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২২৩ জন ফিলিস্তিনি ইসরাইলের বিভিন্ন জেলখানায় শাহাদাত বরণ করেছে। এতে আরো বলা হয়েছে, ৬৪জন বিনা চিকিৎসায়, ৭৩ জন নির্যাতনের কারণে, ৭৫জন আত্মহত্যা এবং সাত জন বন্দি গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদাত বরণ করেছেন। সামি আবু দিয়াক নামে ৩৬ বছর বয়সী একজন ফিলিস্তিনিকে ভিন্ন ভিন্ন মামলায় তিন বার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

ইসরাইলি জেলখানাগুলোতে আটক ফিলিস্তিনিদের ওপর নানাভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ব্যবস্থা রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের তথ্য সংগ্রহের জন্য তাদের ওপর এ নির্যাতন চালানো হয়। ২০১৮ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলের তৎকালীন বিচারমন্ত্রী ইলাত শাকেদ বলেছিলেন, মানবাধিকার উপেক্ষা করে হলেও ইসরাইল শুধুমাত্র ইহুদিদের জন্য হওয়া উচিত।

এদিকে, ফিলিস্তিনি বন্দি ও শরণার্থী বিষয়ক দফতরের প্রধান রাফআত হামদুনে বলেছেন, ‘ফিলিস্তিনি বন্দিদের অবস্থা খুবই নাজুক এবং তাদের ওপর অকথ্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘ইসরাইলই একমাত্র যে কিনা বন্দিদের ওপর নির্যাতন চালানোকে বৈধ বলে মনে করে এবং এমন সব পন্থায় তারা নির্যাতন চালায় যা আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ। আটকাবস্থার শুরু থেকেই তারা বিভিন্ন পন্থায় নির্যাতন চালানো শুরু করে।

বন্দিদের মাথায় ময়লাযুক্ত ও দুষিত প্যাকেট পরিয়ে দেয়া, দিনের পর দিন ঘুমাতে না দেয়া, চিকিৎসা না দেয়া, বন্দিদেরকে হিমাগারে আটকে রাখা, দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা, ইসরাইলের গুপ্তচর হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করা, তাদের মাথায় গরম ও ঠাণ্ডা পানি দেয়া, কানের পর্দা ফাটানো বিকট শব্দ শুনতে বাধ্য করা, টয়লেটে যেতে না দেয়া প্রভৃতির মাধ্যমে বন্দিদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়।

ইসরাইলের কারাগারে আটক ফিলিস্তিনি বন্দিদের সাথে অমানবিক আচরণের আরেকটি ভয়াবহ তথ্য হচ্ছে তাদের ওপর বিভিন্ন ধরনের বিপজ্জনক জৈব পরীক্ষা চালানো হয়।

ইসরাইলি পার্লামেন্টের বিজ্ঞান গবেষণা বিষয়ক কমিটির প্রধান দাইলা ইজিক ১৯৯৭ সালে এ কথা ফাঁস করে দেন যে প্রতি বছর তারা ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর প্রায় এক হাজার ধরণের মেডিকেল পরীক্ষা চালায়।

জর্দানের লেখক আব্দুল্লাহ ক’ক এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায় ইসরাইলের কারাগারে আটক ফিলিস্তিনি বন্দিদেরকে বেআইনিভাবে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ পরীক্ষার কাজে ব্যবহার করা হয়। ইসরাইলিরা যখনই নতুন কোনো ওষুধ তৈরি করে প্রথমেই তা ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর পরীক্ষা চালায়।’

ফিলিস্তিনি বন্দিদেরকে ইচ্ছামত নানা ধরনের খাদ্য খাবার দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। এ কারণে বন্দিরা প্রায়ই জেলখানায় তাদের খারাপ অবস্থার প্রতিবাদ জানিয়ে গণঅনশন করে। ইসরাইলি পার্লামেন্ট ২০১৫ সালের জুলাইয়ে বন্দিদের জন্য বিশেষ খাদ্য আইন পাশ করে। ওই আইনে ফিলিস্তিনি বন্দিরা যখন মূমূর্ষ অবস্থায় থাকবে তখন তাদেরকে জোর করে সন্দেহজনক ওইসব খাদ্য খাবার খাওয়ানোর অনুমতি দেয়া হয়েছে।

ইসরাইলি কর্মকর্তারা স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য জঘন্যতম পদ্ধতি ব্যবহার করে। প্রায় ৯৫ শতাংশ বন্দিকে আটক হওয়া থেকে শুরু করে সাধারণ সেলে স্থানান্তর করা পর্যন্ত সময়ে এসব নির্যাতন চালানো হয়। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ১৯৬৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত অকথ্য নির্যাতনে ৭৩জন বন্দি প্রাণ হারিয়েছে এবং এ অবস্থা অব্যাহত রয়েছে।

বন্দিদেরকে স্বাস্থ্যসেবা না দেয়া এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রেখে এমনভাবে মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয় যাতে তারা ধীরে ধীর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এরই মধ্যে ইসরাইলে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে ইচ্ছাকৃত ফিলিস্তিনি বন্দিদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

ইসরাইলের জেলখানায় ১৯৬৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মোট ১৭ হাজারের বেশ নারী কারা ভোগ করেছে যাদের মধ্যে অনেক বয়স্ক ও কম বয়সী নারীও রয়েছে। আবার অনেক নারী ১৯৬৭ সাল থেকে কারাভোগ করে আসছে।

১৯৮৭ সালে পাথর দিয়ে ইসরাইলকে পাল্টা আঘাত শুরুর মাধ্যমে প্রথম ফিলিস্তিনিদের ইন্তিফাদা গণআন্দোলন শুরু হয়। সে সময় প্রায় তিন হাজার নারীকে ইসরাইলি সেনারা আটক করেছিল।

ফিলিস্তিনি বন্দিদের স্বার্থ দেখাশোনাকারী দফতর থেকে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ সালেও বায়তুল মোকাদ্দাস অবমাননার প্রতিবাদে ফিলিস্তিনিদের দ্বিতীয় ইন্তিফাদা গণআন্দোলন শুরুর পর প্রায় এক হাজার নারীকে গ্রেফতার করে ইসরাইল।

বর্তমানে ৬২ জন নারী কারাভোগ করছে এবং এসব নারী বন্দিরা অত্যন্ত দু:সহ পরিবেশে মানবেতর জীবন যাপন করছে। আটক নারী বন্দিদের অর্ধেক সংখ্যককে ১৬ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া বহু বন্দিকে বিচার ছাড়াই আটকে রাখা হয়েছে।

বর্তমানে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ফিলিস্তিনি বন্দিরা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। অনেক বন্দি করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। ইসরাইলের মন্ত্রীসভা এরই মধ্যে জানিয়েছে এ ভাইরাস ঠেকাতে তারা ব্যর্থ। জেলখানায় স্বাস্থ্যসেবা একেবারেই অপর্যাপ্ত এবং এ ব্যাপারে ইসরাইলে কোনো চিন্তাভাবনা আছে বলে মনে হয় না।

ফিলিস্তিনের বন্দি বিষয়ক দফতরের মুখপাত্র রিয়াজ আল আশকার বলেছেন, ইসরাইলের জেলখানাগুলোতে করোনার প্রাদুর্ভাব ঘটলেও তারা এ ব্যাপারে এখনো প্রয়োজনীয় কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। জীবাণু নাশক কোনো ব্যবস্থা তাদের দেয়া হয়নি। কারারক্ষীরা ছুটিতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হলেও তারা জেলখানায় ডিউটি দেয়া অব্যাহত রেখেছে। বলা হচ্ছে এভাবে ইচ্ছাকৃতভাবেই ফিলিস্তিনি বন্দিদের মধ্যে এ ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। ফলে চরম আতঙ্কের মধ্যে ফিলিস্তিনি বন্দিরা এবং প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যুর প্রহর গুনছে।

যাইহোক, করোনা পরিস্থিতিতে ইসরাইলের জেলখানায় আটক ফিলিস্তিনি বন্দীদের অবস্থা খারাপ হলেও আন্তর্জাতিক সমাজ বিশেষ করে জাতিসংঘ এখন পর্যন্ত ইসরাইলের এ অপরাধযজ্ঞ মোকাবেলায় কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। #

পার্সটুডে/রেজওয়ান হোসেন/

হজরত মুহাম্মদ সা: নিজ হাতে এই মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন

নবীর মসজিদ। আরবিতে বলা হয় মসজিদে নববী। হজরত মুহাম্মদ সা: নিজ হাতে এই মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন।

নবীজি হযরত মুহাম্মদ (সা.) যখন মক্কা থেকে মদীনায় হিযরত করেন, তখন এ শহরটির নাম ছিল ‘ইয়াসরিব’। নবীজি (সা.) আগমনের পরপরই ইয়াসরিব নামটি পবির্তন করে মদিনা নামকরণ করেন।

কিন্তু সেখানে কোন মসজিদ ছিল না যেখানে নবীজিসহ সাহাবীরা নামাজ আদায় করবেন। নতুন হিজরতকারীদের মধ্যে নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদের শূন্যতা দেখা দিলে নবীজি (সা.) নিজেই একটি মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন। আর এ মসজিদের নাম দেন ‘মদীনা মসজিদ’।

যা ‘মসজিদে নববী শরীফ’ (সা.) বা মদিনায়ে মুনাওয়ারা হিসেবে পরিচিত। প্রথম মসজিদটি নির্মাণ করতে সময় লেগেছিল প্রায় ৭ মাস। অর্থাৎ- ৬২২ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে থেকে শুরু হয়ে ৬২৩ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় ৭ মাসব্যাপী ১ম মদিনা মসজিদের নির্মাণ কাজের সময় ধরা হয়।

নবীজি (সা.)-এর হস্ত মোবারকে ভিত্তি দেয়া পবিত্র ‘মদিনা মসজিদ’ নির্মাণের জন্য নাজ্জার গোত্রের সাহল ও সোহাইল নামক দুই যুবক থেকে প্রয়োজনীয় জমি ক্রয় করে ছিলেন। এ জমির ক্ষুদ্র একটি অংশে নবীজি (সা.) বাসস্থান নির্মাণ করে বাকি পুরো অংশেই মদিনা মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু করেন।

এ জায়গার প্রতিটি কোণা থেকে তীর নিক্ষেপ করে যে পরিমাণ জায়গা পাওয়া গেল তা হলো মসজিদের একটি ক্ষেত্র। আর এ ক্ষেত্রে বর্গের প্রতিটি বাহুর পরিমাণ দাঁড়ালো ১০০ হাত বা ৫৬ গজ। ১ম নির্মিত পবিত্র মদিনা মসজিদের প্রাথমিক আয়তন ছিল ১০০ ´ ১০০ হাত বা ৫৬ ´ ৫৬ গজ।

মসজিদের ভিত্তি ও দেয়ালের নিম্নভাগ ৩ হাত পর্যন্ত প্রস্তের হিসেবে নির্মিত ছিল। প্রথম পর্যায়ে মদিনা মসজিদ রৌদ্রে শুষ্ক ইট দ্বারা নির্মিত হয়। এই রৌদ্র শুষ্ক ইট ও সিমেন্ট হিসেবে আল-খাবখাবা উপত্যকা হতে আনিত কাদা দ্বারা তৈরি হয়েছিল। তখন মদিনা মসজিদের দেয়াল ছিল ৭ হাত উঁচু। এর ছাদকে শক্তিশালী ও মজবুত রাখার জন্য মদিনা মসজিদের ৩৬টি খেজুর গাছকে স্তম্ভ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।

মসজিদের ছাদ নির্মিত হয়েছিল খেজুর পাতা দিয়ে। ছাদকে সুন্দর, রৌদ্র ও বৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য খেজুর পাতার উপর কাদামাটির আস্তরণ লেপে দেয়া হয়েছিল। ১ম নির্মিত পবিত্র মদিনা মসজিদে প্রবেশের জন্য ৩টি দরজা ছিল।

প্রধান প্রবেশ পথটি ছিল দক্ষিণ দিকে যা দিয়ে মুসল্লিরা মসজিদে প্রবেশ করতেন এবং বাহির হতেন। পশ্চিম দেয়ালে ছিল মসজিদের দ্বিতীয় প্রবেশ পথ যা ‘বাবে রহমত’ নামে স্বীকৃত। তৃতীয় প্রবেশ পথটি ছিল পূর্ব দেয়ালে যা দিয়ে নবীজি হযরত মুহাম্মদ (সা.) মসজিদে প্রবেশ করতেন। এ জন্য এটির নামকরণ হয় ‘বাব উন নবী (সা.)’।

ঐতিহাসিকদের মতে, মদিনা মসজিদেই সর্ব প্রথম মেহরাব, মিম্বার, আজান দেয়ার স্থান বা মিনার এবং অজুর স্থানের ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে মসজিদে নববী শরীফ বহুগুণ বড় ও সম্প্রসারিত। সম্পূর্ণ আধুনিক নতুন নকশার ভিত্তিতে এটিকে সম্প্রসারণ ও পুনঃনির্মাণ করা হয়েছে। যাহাতে এক সাথে কয়েক লাখ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।

সংস্কার ও সম্প্রসারণ
পবিত্র মসজিদে নববী (সা.) বা মদিনা মসজিদ তখন থেকেই মুসলমান শাসকদের দ্বারা বহুবার সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। নবীজি হযরত মুহাম্মদ (সা.) বিদায় নেয়ার পর ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর (রা.) ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে মসজিদে নববী (সা.)’র একদফা সম্প্রসারণ ও সংস্কার কাজ করেন।

এসময় মসজিদের উত্তরে ৩০ হাত, দক্ষিণে ১০ হাত ও পশ্চিম দিকে ২০ হাত প্রশস্ত করেন। খলীফা হযরত ওমর (রা.)’র সময় মসজিদের জায়গার পরিমাণ হয় উত্তর-দক্ষিণে ১৪০ হাত এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১২০ হাত।

এরপর ৩য় খলীফা হযরত ওসমান গণি জিন্ নূরাইন (রা.)’র খেলাফতকালে ৬৪৬-৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে খেজুর পাতার পরিবর্তে মসজিদের ছাদে ব্যবহার করা হয় সেগুন গাছের কাঠ। তখন ছাদের আকার দাঁড়ায় ১৬০ ´ ১৩০ হাত। এ সময় মসজিদের আয়তন হয় উত্তর দক্ষিণে ১৬০ হাত এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১৫০ হাত।

পরবর্তীতে খলিফা আল্ ওয়ালিদের সময় মদিনা মসজিদটি আধুনিক ইমারতে পরিণত হয়। ওয়ালিদ ৭০৭ খ্রিস্টাব্দে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে পবিত্র মসজিদে নববী (সা.)-কে সাজিয়ে তোলেন।

তাঁর সময় মসজিদে নববী (সা.)’র আয়তন বেড়ে দাঁড়ায় ২০০ ´ ২০০ হাত। ৭০৭ খ্রিস্টাব্দের এসময়ই সর্ব প্রথম পবিত্র মসজিদে নববী (সা.)’র ৪ কোণায় ৪টি মিনার নির্মাণ করেন বাদশা বা খলিফা আল-ওয়ালিদ। তখন প্রতিটি মিনারের উচ্চতা ছিল ৫০ হাত এবং প্রস্থে ছিল ৮ হাত। এরপর খলিফা মাহদী ৭৭৫-৭৮৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এ পবিত্র মসজিদটি আবারো সম্প্রসারণসহ সংস্কার করেন এসময় এ আয়তন দাঁড়ায় ৩০০ ´ ৩০০ হাত। পরবর্তীতে ১৪৮১ খ্রিস্টাব্দে মামলুক সুলতান কয়েত-বে পবিত্র মসজিদে নববী (সা.)-এর মধ্যে গম্বুজ প্রতিষ্ঠিত করেন।

কিন্তু ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে পবিত্র এ গম্বুজ শরীফে রং-এর আস্তরণ দিয়ে সবুজ গম্বুজ বানিয়ে ছিলেন ওসমানী সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ। আর সেই থেকেই আজঅবধি মদিনায়ে মুনাওয়ারা তথা পবিত্র মসজিদে নববী শরীফের উপর নূরানী এ সবুজ গম্বুজ শরীফটি কোটি কোটি ঈমানদার তথা আশেকে রাসুল (সা.)দের মাঝে আলোকবর্তিকা ও প্রাণস্পন্দন হয়ে আছে। যা কিয়ামত পর্যন্ত ঈমানি চেতনা দান করবেন নবী প্রেমিকদের অন্তরে।

সর্বশেষ আধুনিকায়নে পবিত্র মসজিদ-এ নববী (সা.)’র নব সজ্জা ও রূপদান করেন সৌদি বাদশাহ আব্দুল আজিজ ইবনে সউদ। এর পরিকল্পনা করা হয় ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে। ১৯৫৩-১৯৫৫ সাল নাগাদ মসজিদ আধুনিকায়ন করা হয়। বিশালকার এ পবিত্র মসজিদে নববী (সা.)’র সমস্ত রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সৌদি রাজ পরিবারের।

মসজিদের পাশেই ছিল হজরত মুহাম্মদ সা: এর বসবাসের ঘর। মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে রয়েছে একটি সবুজ গম্বুজ। গম্বুজটি নবীর মসজিদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ এ গম্বুজের নিচেই রয়েছে শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর রওজা মোবারক। হজরত মুহাম্মদ সা: মসজিদের পাশে যে ঘরে ইন্তেকাল করেন সেখানেই তাকে দাফন করা হয়।

পরে মসজিদ সম্প্রসারণের মাধ্যমে তার রওজা মোবারক মসজিদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

পবিত্র মসজিদে নববী (সা.) তথা মহানবী (সা.)’র রওজা পাকের দু’পাশেই রয়েছে নবীজির প্রাণপ্রিয় ছিদ্দীক ইসলামের ১ম খলিফা হযরত আবুবকর (রা.) ও ২য় খলিফা ফারুকে আজম হযরত ওমর (রা.)-এর রাওজা শরীফ। আল্লাহ আমাদের সকলকে নূরানী নবীজির (সা.) নূরী রাওজায়ে আকদাস শরীফ জেয়ারতের মাধ্যমে জীবনকে ধন্য করার তৌফিক দান করুন। আমীন।

পৃথিবীর প্রথম জমিন হচ্ছে পবিত্র কাবাঘর

মুসলিম ইম্মাহর ভাষ্য মতে এটাকে বলা হয় বাইতুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর। কাবা শরিফ ও পবিত্র কাবাঘরও বলা হয়ে থাকে। এই পবিত্র কাবা ঘরের অভিমুখী হয়েই আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করেন পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলিম। সৃষ্টির সূচনা থেকেই মহান পবিত্র এই কাবাকে মহান আল্লাহ তার মনোনীত বান্দাদের মিলনস্থল করেছেন।

আমরা সকলেই জানি , ভৌগোলিকভাবেই গোলাকার পৃথিবীর মধ্যস্থলে কাবার অবস্থান। এ বিষয়ে পিএইচডি করেছেন ড. হুসাইন কামাল উদ্দীন আহমদ। তাঁর থিসিসের শিরোনাম হলো—‘ইসকাতুল কুররাতিল আরধিয়্যা বিন্ নিসবতে লি মাক্কাতিল মুকাররামা।’ (মাজাল্লাতুল বুহুসুল ইসলামিয়া, রিয়াদ : ২/২৯২)

ওই থিসিসে তিনি প্রাচীন ও আধুনিক দলিল-দস্তাবেজের আলোকে এ কথা প্রমাণ করেছেন যে কাবাই পৃথিবীর মেরুদণ্ড ও পৃথিবীর মধ্যস্থলে অবস্থিত। ইসলামের রাজধানী হিসেবে কাবা একটি সুপরিচিত নাম। পানিসর্বস্ব পৃথিবীতে মাটির সৃষ্টি এ কাবাকে কেন্দ্র করেই।

আরেকটি বিষয় হলো, মাটিতে রূপান্তর হওয়ার আগে কাবা সাদা ফেনা আকারে ছিল। সে সময় পৃথিবীতে পানি ছাড়া কিছু ছিল না। আল্লাহর আরশ ছিল পানির ওপর। হাদিসের ভাষ্য মতে, কাবার নিচের অংশটুকু পৃথিবীর প্রথম জমিন। বিশাল সাগরের মাঝে এর সৃষ্টি। ধীরে ধীরে এর চারপাশ ভরাট হতে থাকে। সৃষ্টি হয় একটি বিশাল মহাদেশের। এক মহাদেশ থেকেই সৃষ্টি হয় অন্য সব মহাদেশ। মাটি বিছানোর পর জমিন নড়তে থাকে। হেলতে থাকে।

এর জন্য মহান আল্লাহ পাহাড় সৃষ্টি করেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বত স্থাপন করেছেন, যাতে পৃথিবী তোমাদের নিয়ে আন্দোলিত না হয় (হেলে না যায়)।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ১৫)

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.