আমরা সেই মুসলিম, আমরা বীরের জাতি

আমাদের সম্পর্কে জানতে চাও? তাহলে জিজ্ঞেস করো ইরাক, সিরিয়া ও স্পেনের কাছে। জিজ্ঞেস করো মিসর ও আরব-উপদ্বীপের কাছে। জিজ্ঞেস করো আফ্রিকা ও অনারব দেশগুলোর কাছে। জিজ্ঞেস করো আসমানের নিচে জমিনের ওপরে প্রতিটি ভূখণ্ডের কাছে। সবার কাছে পাবে আমাদের শৌর্য-বীর্য, ত্যাগ-তিতিা, গর্ব-গৌরব, কীর্তিকলাপ এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাস। হ্যাঁ, আমরা সেই মুসলিম জাতি…

গর্ব-গৌরবের তৃণভূমি সিক্ত করেছে, সে তো আমাদেরই রক্ত! শৌর্য-বীর্যের বাগান সজ্জিত করেছে, সে তো আমাদের শহীদানেরই রক্তিম খুন! পৃথিবী কি আমাদের চেয়ে বেশি সম্ভ্রান্ত, বেশি দয়ালু, বেশি সম্মানিত, বেশি জ্ঞানের অধিকারী কোনো জাতি সম্পর্কে অবহিত আছে?

আমরা যখন আলোকিত দিশারি পেয়েছি, পৃথিবী তখন মূর্খতার অন্ধকারে নিমজ্জিত। পৃথিবীবাসীকে আমারা তখন বললামÑ এই যে সঠিক পথ।
প্রতিটি জাতি যখন স্বৈরাচারের লাঠি উত্তোলন করেছে, আমরা তখন ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেছি।

মানুষ যখন জ্ঞানকে নিজগৃহ থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছে, জ্ঞান তখন আমাদের নির্মিত ‘ইলমের ভুবনে’ আশ্রয় নিয়েছে। মানুষ যখন তাদের রাজাদের গোলামি করছে এবং নেতাদের প্রভুর মতো সম্মান করছে, আমরা তখন দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেছিÑ সাম্য ও সমতার।

আমরা মানুষকে ঈমানি চেতনায় উজ্জীবিত করেছি। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতা-সংস্কৃতির আলো দিয়েছি। দিয়েছি স্বাধীনতার অনাবিল সুখ। হ্যাঁ, আমরা সেই মুসলিম জাতি।

আমরা গড়েছি কুফা, বসরা, কায়রো ও বাগদাদ। আমরা নির্মাণ করেছি ইরাক, সিরিয়া, স্পেন ও মিসরের সভ্যতা। আমরা প্রতিষ্ঠা করেছি বায়তুল হিকমা, মাদরাসায়ে নিজামিয়া, জামে আজহার ও কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়।

আমরা আবাদ করেছি কুব্বাতুস সাখরা, সুররা মান রাআ, আজজাহরা, আলহামরা, জামে উমাবি, মসজিদে সুলতান আহমদ ও তাজমহল। আমরা পৃথিবীবাসীকে শিখিয়েছি। আমরা ছিলাম শিক, আর তারা ছিল ছাত্র। হ্যাঁ, আমরা সেই মুসলিম জাতি।

আমাদের আছে আবুবকর, উমর, নুরুদ্দিন, সালাহউদ্দিন, আরোঙ্গজেব। আমাদের আছে খালিদ, তারিক, কুতাইবা, ইবনে কাসেম, মালিক জাহের। আমাদের আছে বুখারি, তাবারি, ইবনে তাইমিয়া, ইবনে কাইয়েম, ইবনে হাজাম, ইবনে খলদুন। আমাদের আছে রাজি, গাজ্জালি, ইবনে রুশদ, ইবনে সিনা। আছে খলিল, জাহেজ, আবু হাইয়ান। আছে আবু তাম্মাম, মুতানাব্বি, মাআররি।

আছে মাবাদ, ইসহাক, জিয়ারাব। আমাদের মধ্যে আছে এমন এমন খলিফা, যারা ছিলেন সুউচ্চ মানবতার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। আমাদের মধ্যে আছে এমন এমন সেনাপতি যারা ছিলেন ‘আল্লাহর তরবারি’। আমাদের মধ্যে আছে এমন এমন আলেম, যারা ছিলেন মানুষের মধ্যে দেহের মাথার মতো। আমাদের মধ্যে আছে এমনই হাজার হাজার মহান ব্যক্তিত্ব। হ্যাঁ, আমরা সেই মুসলিম জাতি।

আমাদের শক্তি আমাদের ঈমানে, আমাদের ইজ্জত আমাদের দ্বীনে, আমাদের আস্থা আমাদের রবের প্রতি। আমাদের সংবিধান আমাদের কুরআন, আমাদের ইমাম আমাদের নবী, আমাদের আমির আমাদের খাদেম। ন্যায়বান দুর্বল ব্যক্তি আমাদের মধ্যে সবল, আমাদের সবল ব্যক্তি দুর্বলের সহযোগী। আর আমরা সবাই দ্বীনিভাই। দ্বীনের েেত্র আমরা সবাই সমান। আমাদের মধ্যে নেই কোনো ভেদাভেদ। হ্যাঁ, আমরা সেই মুসলিম জাতি।

আমরা রাজত্ব করলে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেছি। নির্মাণ করলে উন্নত করেছি। কোনো দেশ বিজয় করলে দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েছি।

আমরা ছিলাম ন্যায়পরায়ণ ও শক্তিশালী। যুদ্ধে আমরা দয়া ও করুণার পথ অনুসরণ করেছি। আর সন্ধির েেত্র ন্যায়ের পন্থা প্রবর্তন করেছি। আমরা ছিলাম শ্রেষ্ঠ শাসক ও দিগি¦জয়ী নেতা।
আমরা নির্মাণ করেছি এমন সভ্যতা যা ছিল কল্যাণ ও বরকতে পূর্ণ। আর এটা ছিল আত্মা ও দেহের সভ্যতা, মর্যাদা ও সৌভাগ্যের সভ্যতা।

এর উপকারও মানুষের মধ্যে ব্যাপক হয়েছিল এবং এর ছায়া পৃথিবীবাসীর ওপর বিস্তৃত হয়েছিল। আমরা আমাদের রক্তে এ সভ্যতাকে সিক্ত করেছি। আমাদের শহীদানের লাল খুনে আমরা এ সভ্যতা নির্মাণ করেছি। হ্যাঁ, আমরা সেই মুসলিম জাতি।

সুউচ্চ মানবতার দৃষ্টান্ত আমাদের মধ্যেই বাস্তবায়িত হয়েছে। পৃথিবী যদি কোনো মানবতার সমাবেশ সম্পর্কে জেনে থাকে, তাহলে সেটা হবে আমাদের সমাবেশ। যার ভিত্তি হলো আখলাক ও চরিত্র, সিদক ও সততা এবং ঈসার ও অগ্রাধিকার।

দার্শনিকদের স্বপ্ন-সাধনা, মুসলিহীন ও যুগ সংস্কারকদের যে আশা-আকাক্সা তা ইসলামের শুরুলগ্নেই বাস্তবায়িত হয়েছিল। স্মরণ করো ইয়ারমুক যুদ্ধে প্রচণ্ড আঘাতপ্রাপ্ত এক মুসলিমের সেই দৃষ্টান্ত বিরল আত্মোৎসর্গের কথা!

খুব আহত অবস্থায় তিনি একটু পানি পান করতে চাইলেন। যখন তার কাছে পানপাত্র আনা হলো, তখন তিনি দেখলেন অন্য এক আহত ভাইকে। নিজের ওপর সেই আহত ভাইকে তিনি অগ্রাধিকার দিলেন। আর নিজে পানি পান না করে পিপাসার্ত অবস্থায় মারা গেলেন।

স্মরণ করো সেই পুণ্যবতী মুসলিম নারীর কথা! যার স্বামী, ভাই ও বাবা সবাই যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। সাহাবারা তাকে তাদের মৃত্যু-সংবাদ দিতেই তিনি বলে ওঠেন, আগে বলো আল্লাহর রাসূলের কী অবস্থা? সাহাবারা জানালেন, তিনি ভালো আছেন। সে মহিলা বললেন, আল্লাহর রাসূল জীবিত থাকলে অন্য সব মুসিবত তুচ্ছ, অতি তুচ্ছ।

স্মরণ করো সেই সাহসী বৃদ্ধার কথা! ওমর রা: তখন সরকারি মিম্বারে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। এই বৃদ্ধা নারী ওমর রা:-এর বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে তাঁর ভুল ধরিয়ে দেন।

অথচ ওমর রা: তখন বর্তমান সময়ের এগারোটি রাজ্য শাসন করছেন।
তখন আমাদের প্রত্যেকেই নিজের জন্য যা পছন্দ করতেন, তার মুসলিম ভাইয়ের জন্যও তা পছন্দ করতেন। নিজে অভাবগ্রস্ত হলেও তার মুসলিম ভাইকে অগ্রাধিকার দিতেন। আমরা তখন আত্মিক ও দৈহিক এবং শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থেই শুচি-শুভ্রতা ও পূত-পবিত্রতার অধিকারী ছিলাম।

তখন আমাদের কাজকর্ম, ওঠাবসা এবং যাওয়া-আসাÑ সবই হতো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। তখন আমাদের প্রবৃত্তি কুরআনের অনুগামী ছিল। কিন্তু এখন আমরা প্রবৃত্তির অনুগামী। তাই সে আমাদের জীবনকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তখন আমরা ছিলাম খাঁটি মনের মানুষ। ছিলাম মানবতার অকৃত্রিম বন্ধু। দার্শনিক ও যুগ সংস্কারকেরা তখন যে আশা-আকাক্সা করতেন, আমরা তা বাস্তবে রূপ দিয়েছিলাম। হ্যাঁ, আমরা সেই মুসলিম জাতি।

আমাদের গর্ব-গৌরব যদি লেখা হয় তাহলে শত কাব্যগাথা লেখা যাবে। লেখা যাবে শাহনামার মতো হাজারো মহাকাব্য। কিন্তু এরপরও আমাদের গৌরবগাথা শেষ হবে না। কেননা তা অসংখ্য ও অগণিত। কে গুনবে আমাদের সাফল্যমণ্ডিত যুদ্ধগুলো? কে হিসাব করবে জ্ঞানবিজ্ঞানে আমাদের কীর্তিকলাপ?

কে পর্যালোচনা করবে আমাদের শৌর্য-বীর্য ও বীরত্বের অধিকারীদের? সিরাতের হাজার কিতাব লিখুন। ইতিহাসের হাজার গ্রন্থ রচনা করুন। তবু শেষ হবে না আমাদের গৌরবোজ্জ্বল সিরাত লেখা ও স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাস রচনা করা। হ্যাঁ, আমরা সেই মুসলিম জাতি।

আমরা নিজ ভাষাভাষীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ এমন জাতি নই। হ্যাঁ, প্রত্যেক জাতির মধ্যে ভালো ও মন্দ লোক আছে। আমরা এমন জনগোষ্ঠীও নই, যারা শুধু রক্তের বন্ধনেই আবদ্ধ। হ্যাঁ, প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সৎ ও অসৎ লোক আছে। তবে আমরা হলাম বড় কল্যাণকর একটি সংগঠন। প্রত্যেক জাতির সম্মানী, মুত্তাকি ও পূতপবিত্র ব্যক্তিরা এর সদস্য। রক্তারক্তি ঘটলে তাকওয়াই আমাদের একত্র করে। আর ভাষা-বৈষম্য হলে আকিদাই আমাদের ঐক্যবদ্ধ করে।

ঘরবাড়ি যদি আমদের থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে কাবাই আমাদের নিকটবর্তী করে। আমরা দিনে পাঁচবার এই কাবার অভিমুখী হই। বছরে একবার আরাফায় একত্র হই। এটা ইসলাম যে একটা একত্রকারী বিধান তার প্রতীক। যে সম্প্রদায়ের প্রাণকেন্দ্র হেজাজে আরবি ও যার ইমাম নবিয়ে আরবি এবং যার কিতাব পবিত্র কুরআন। হ্যাঁ, আমরা সেই মুসলিম জাতি।

আমাদের দ্বীন শ্রেষ্ঠ দ্বীন, আমাদের দ্বীন সুস্পষ্ট হক দ্বীন। এতে কোনো পর্দা ও আড়াল নেই এবং গুপ্ত ও লুক্কায়িত কিছু নেই। মিনার থেকে প্রতিদিন আজানের সুস্পষ্ট প্রতিধ্বনিতে কি এই অর্থ নেই? পৃথিবীতে কি এমন কোনো সংগঠন বা মতবাদ আছে, যার মূলনীতিগুলো প্রতিদিন দশবার পুনরাবৃত্তি ও প্রচার করা হয়? না, নেই। শুধু মুসলমানদের দ্বীনের মূলনীতিগুলোই প্রতিদিন এভাবে প্রচার করা হয়। মুয়াজ্জিনের সুরেলা কণ্ঠে ঘোষিত হয়Ñ আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। আশহাদু আল্লাহ ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ। হ্যাঁ, আমরা সেই মুসলিম জাতি।

আমরা ভীত হই না এবং চিন্তিতও হই না। কারণ আল্লাহ আমাদের সাথেই আছেন। আর আমরা দিনে ত্রিশবার এই পবিত্র আহ্বান ও শক্তিশালী ধ্বনি শুনিÑ আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। বীরত্ব ও সাহসিকতা আমাদের স্বভাব। ত্যাগ ও কোরবানির মহব্বত আমাদের শিরায় শিরায় প্রবাহিত। যুগের বিপদ-আপদ আমাদের অন্তর থেকে আত্মোৎসর্গের এই মহব্বতকে কিছুতেই মুছতে পারবে না।

আরব উপদ্বীপ আমাদেরই। প্রত্যেক তাগুতি শক্তি তার সম্পদ পদদলিত করছে। আর এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতেও তার অধিবাসীরা জান্নাতি ভুবনে আরামেই বাস করছে। সিরিয়া ও তার ‘গওতা’ নামক অঞ্চলও আমাদের, যে অঞ্চল রক্তে সিক্ত হয়েছিল। ইরাক আমাদের, রামিসা ও ফোরাতের সমতল ভূমিও আমাদের।

ফিলিস্তিন আমাদের, যাতে রয়েছে অগ্নিপাহাড়। মিসর আমাদের, যা জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র এবং ইসলামের প্রত্যাবর্তনস্থল। পুরো পশ্চিমা বিশ্বও আমাদের, রিফ নামক অঞ্চলও আমাদের, যেটা ছিল ত্যাগ ও বীরত্বের ভুবন। মিনার ও গম্বুজবিশিষ্ট কনস্টান্টিনোপল শহর আমাদের, জাভা দ্বীপ, পারস্য, আফগান ও হিন্দুস্তানও আমাদের। পৃথিবীর প্রতিটি ভূখণ্ড আমাদের যেখানে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করা হয়, যে ভূখণ্ডের মসজিদের মিনার থেকে উচ্চৈঃস্বরে আজানের ধ্বনি ঘোষিত হয়। আর তাই ভবিষ্যৎ আমাদেরই জন্য; যদি আমরা ফিরে যাই আমাদের দ্বীনের কাছে।
মূল লেখক : বিশ্বখ্যাত আরবি সাহিত্যিক